মোদীর ব্রিকস সম্মেলনের মাঝেই রক্তাক্ত ভারতীয় শেয়ারবাজার! কয়েক মিনিটেই উধাও ₹৬ লক্ষ কোটি, কেন এই ভয়াবহ পতন?
নয়াদিল্লিতে যখন প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদীর নেতৃত্বে ১৮তম BRICS সম্মেলনে বিশ্বের একাধিক রাষ্ট্রনেতা বৈঠকে ব্যস্ত, তখনই প্রবল বিক্রির চাপে কেঁপে উঠেছিল ভারতীয় শেয়ারবাজার। ১১ সেপ্টেম্বরের লেনদেনের শুরুতেই বাজারমূল্য প্রায় ₹৬ লক্ষ কোটি কমে যায় বলে রিপোর্ট। পরে অবশ্য বাজার কিছুটা ঘুরে দাঁড়ায় এবং দিনের শেষে Sensex ও Nifty-র পতন অনেকটাই কমে আসে। মূল চাপের কারণ ছিল মধ্যপ্রাচ্যের উত্তেজনা, অপরিশোধিত তেলের দাম বৃদ্ধি, দুর্বল টাকা ও বিদেশি বিনিয়োগকারীদের বিক্রি।
লিখেছেন
Priya Jana
একদিকে দিল্লিতে BRICS-এর মঞ্চে নরেন্দ্র মোদী, শি জিনপিং, ভ্লাদিমির পুতিন-সহ বিশ্বের একাধিক রাষ্ট্রনেতার উপস্থিতি। অন্যদিকে দেশের আর্থিক বাজারে বড় ধাক্কা! ১১ সেপ্টেম্বর, শুক্রবার ভারতীয় শেয়ারবাজারে ব্যাপক অস্থিরতা দেখা যায়। দিনের শুরুতেই Sensex ৭০০ পয়েন্টেরও বেশি নেমে যায় এবং মাত্র কয়েক মিনিটের মধ্যে BSE-তে তালিকাভুক্ত সংস্থাগুলির মোট বাজারমূল্য প্রায় ₹৬ লক্ষ কোটি কমে যায়।
তবে এটিকে সরাসরি ভারতের অর্থনীতির পতন বা ‘রক্তাক্ত ভারত’-এর প্রমাণ হিসেবে দেখলে বিষয়টি অতিরঞ্জিত হবে। দিনের শেষে বাজারের ক্ষতি অনেকটাই সামলে নেয়।
কয়েক মিনিটেই উধাও ₹৬ লক্ষ কোটি!
শুক্রবারের ট্রেডিং সেশনের শুরুতে Sensex প্রায় ৭৪,১৬০-এর ঘরে নেমে যায়। Nifty 50-ও প্রায় ১ শতাংশ পড়ে ২৩,২৩১-এর কাছাকাছি চলে আসে।
এই তীব্র পতনের জেরে BSE-তে তালিকাভুক্ত সংস্থাগুলির মোট বাজারমূল্য আগের দিনের প্রায় ₹৪৮৪ লক্ষ কোটি থেকে প্রায় ₹৪৭৮ লক্ষ কোটিতে নেমে যায়। অর্থাৎ, প্রথম কয়েক মিনিটেই প্রায় ₹৬ লক্ষ কোটি বাজারমূল্য কমে যায়।
তবে মনে রাখতে হবে, এই ‘₹৬ লক্ষ কোটি উধাও’ মানে সেই পরিমাণ নগদ টাকা কোথাও থেকে তুলে নেওয়া হয়েছে এমন নয়। শেয়ারের বাজারদর কমার ফলে সংস্থাগুলির মার্কেট ক্যাপিটালাইজেশন কমেছে।
কেন এত বড় ধাক্কা শেয়ারবাজারে?
এর পিছনে একাধিক আন্তর্জাতিক ও দেশীয় কারণ একসঙ্গে কাজ করেছে।
প্রথম কারণ—মধ্যপ্রাচ্যের সংঘাত। পরিস্থিতি আরও উত্তপ্ত হওয়ায় আন্তর্জাতিক বাজারে অপরিশোধিত তেলের সরবরাহ নিয়ে উদ্বেগ বেড়েছে। Brent crude একসময় ব্যারেলপ্রতি ১০৭-১০৮ ডলারের কাছাকাছি উঠে যায়। ভারত যেহেতু বিপুল পরিমাণ অপরিশোধিত তেল আমদানি করে, তাই তেলের দাম বাড়লে দেশের আমদানি বিল ও মূল্যস্ফীতির উপর চাপ বাড়তে পারে।
দ্বিতীয় কারণ—বিদেশি বিনিয়োগকারীদের বিক্রি। বিদেশি বিনিয়োগকারীরা ভারতীয় শেয়ার থেকে টাকা তুলে নেওয়া অব্যাহত রেখেছেন। ১১ সেপ্টেম্বরের লেনদেনে FPIs প্রায় ₹৯৩০.৯ কোটি মূল্যের ভারতীয় শেয়ার বিক্রি করেন বলে NSE-র তথ্য উদ্ধৃত করে রিপোর্ট করা হয়েছে।
তৃতীয় কারণ—দুর্বল ভারতীয় মুদ্রা। সপ্তাহের শেষে ডলারের তুলনায় টাকা প্রায় ₹৯৫.৫৫-এ বন্ধ হয়। এক সপ্তাহে টাকার দর প্রায় ১.১ শতাংশ কমেছে, যা কয়েক মাসের মধ্যে অন্যতম বড় সাপ্তাহিক পতন।
দিন শেষে কি সামলে নিল বাজার?
হ্যাঁ। সকালের ভয়াবহ পতনের পর বাজার অনেকটাই ঘুরে দাঁড়ায়।
শুক্রবারের লেনদেন শেষে Sensex ১২০.৮৩ পয়েন্ট বা ০.১৬ শতাংশ কমে ৭৪,৭৮১.৭৬-এ বন্ধ হয়। অন্যদিকে Nifty 79.70 পয়েন্ট বা ০.৩৪ শতাংশ কমে ২৩,৩৯৮.১০-এ থামে।
তবে সপ্তাহের হিসাবে ছবিটা বেশ দুর্বল। Sensex ও Nifty—দুটিই টানা পঞ্চম সপ্তাহে পতন দেখেছে। ওই সপ্তাহে Sensex ২.২৬ শতাংশ এবং Nifty ২.০৯ শতাংশ কমেছে।
তবে কি ভারতের অর্থনীতি ডুবছে?
এখনই এমন সিদ্ধান্তে পৌঁছনোর কারণ নেই।
শেয়ারবাজারে বড় পতন অর্থনীতির জন্য উদ্বেগের কারণ হতে পারে, কিন্তু এক বা কয়েক দিনের বাজার-পতনকে সরাসরি অর্থনৈতিক মন্দার প্রমাণ বলা যায় না।
বর্তমান পরিস্থিতিতে বাজারের মূল উদ্বেগ হল—তেলের দাম যদি দীর্ঘদিন ১০০ ডলারের উপরে থাকে, তাহলে আমদানি খরচ ও মূল্যস্ফীতির চাপ বাড়তে পারে। একই সঙ্গে বিশ্বজুড়ে বন্ডের সুদ বেড়ে গেলে বিনিয়োগকারীরা ঝুঁকিপূর্ণ বাজার থেকে টাকা সরিয়ে নিতে পারেন।
অর্থাৎ, আপাতত বিষয়টি বিশ্ব অর্থনীতি ও ভূ-রাজনৈতিক অনিশ্চয়তার ধাক্কা হিসেবেই দেখা হচ্ছে। ভারতীয় অর্থনীতি সত্যিই মন্দায় ঢুকছে কি না, তা বোঝার জন্য GDP বৃদ্ধি, শিল্প উৎপাদন, কর্মসংস্থান, মূল্যস্ফীতি, ভোক্তা চাহিদা ও বিনিয়োগের মতো আরও অনেক সূচক দেখতে হবে।
BRICS-এর সময়েই কেন নজরে এই পতন?
দিল্লিতে ১২-১৩ সেপ্টেম্বর অনুষ্ঠিত ১৮তম BRICS সম্মেলনে মোদী, জিনপিং, পুতিন, ইরানের প্রেসিডেন্ট মাসুদ পেজেশকিয়ান-সহ একাধিক রাষ্ট্রনেতা অংশ নেন। সম্মেলনে বিশ্ব অর্থনীতি, বাণিজ্য, জ্বালানি, সরবরাহ-শৃঙ্খল এবং ভূ-রাজনৈতিক উত্তেজনা নিয়ে আলোচনা হয়েছে।
সেই সময়েই দেশের শেয়ারবাজারে এমন অস্থিরতা তৈরি হওয়ায় বিষয়টি স্বাভাবিকভাবেই আরও বেশি নজর কেড়েছে। কিন্তু BRICS সম্মেলন এবং শেয়ারবাজারের পতনের মধ্যে সরাসরি কোনও কারণ-সম্পর্ক রয়েছে—এমন প্রমাণ নেই।
সুতরাং ‘কোটি কোটি টাকা আগুনে পুড়ে গেল’—শিরোনামটি নাটকীয় হলেও বাস্তব ছবি হল, বাজারমূল্য কমেছে; নগদ টাকা আগুনে পুড়ে যাওয়ার মতো ঘটনা ঘটেনি। বাজারের পরবর্তী গতিপথ অনেকটাই নির্ভর করবে তেলের দাম, মধ্যপ্রাচ্যের পরিস্থিতি, বিদেশি বিনিয়োগের প্রবাহ এবং বিশ্বজুড়ে সুদের হারের গতিপথের উপর।
Keep reading
More in ব্যবসা-বাণিজ্যের
ব্যবসা-বাণিজ্যের
Sunday Bank Open: রবিবার ২৭ সেপ্টেম্বর খোলা থাকবে ব্যাঙ্ক, ধর্মঘটের আগে RBI-এর বড় সিদ্ধান্ত
রবিবার সাধারণত ব্যাঙ্ক বন্ধ থাকলেও ২৭ সেপ্টেম্বর ২০২৬ বিশেষভাবে ব্যাঙ্কিং পরিষেবা চালু রাখার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। অর্থ মন্ত্রকের নির্দেশ…
ব্যবসা-বাণিজ্যের
মাত্র ৫ মিনিটের Google Meet! একসঙ্গে ৮০ ভারতীয় কর্মীর চাকরি গেল?
মাত্র পাঁচ মিনিটের একটি Google Meet-এ প্রায় ৮০ জন ভারতীয় কাস্টমার সাপোর্ট কর্মীকে চাকরি থেকে ছাঁটাই করা হয়েছে বলে অভিযোগ। Reddit-এ এক প্রাক্…
ব্যবসা-বাণিজ্যের
Bank of Baroda Jobs 2026: ২,৪৮২ পদে নিয়োগ করছে ব্যাঙ্ক অফ বরোদা, স্নাতক হলেই কি করা যাবে আবেদন? জানুন যোগ্যতা
চাকরিপ্রার্থীদের জন্য বড় সুযোগ। Bank of Baroda-তে Local Bank Officer পদে মোট ২,৪৮২ জন নিয়োগ করা হবে। স্নাতক ডিগ্রি থাকলেই প্রাথমিক শিক্ষাগত…
ব্যবসা-বাণিজ্যের
Vijay Mallya News: সরকার ‘অবিচার’ করেছে, তিনি ‘পলাতক’ নন! দাবি বিজয় মাল্যের, জানালেন ৬২০৩ কোটির ঋণ ছিল, ১৪১৩১ কোটি আদায় করেছে ED
বিজয় মাল্য ফের তাঁর বিরুদ্ধে চলা আইনি প্রক্রিয়া এবং ‘পলাতক’ তকমা নিয়ে সরব হয়েছেন। তাঁর দাবি, ₹৬,২০৩ কোটির ঋণের বিপরীতে তাঁর কাছ থেকে ₹১৪,১৩১…
ব্যবসা-বাণিজ্যের
Gold Price: সপ্তাহের শুরুতেই সোনা-রুপোর দামে বড় চমক, কতটা কমল? না কি বাড়ল দাম? আজকের রেট জানুন
সপ্তাহের শুরুতেই সোনা ও রুপোর বাজারে দেখা গেল বড়সড় ওঠানামা। ১৫ সেপ্টেম্বর ২০২৬-এ আন্তর্জাতিক বাজারের চাপ এবং মার্কিন সুদের হার সংক্রান্ত অ…
ব্যবসা-বাণিজ্যের
Gold Price Today: সোনার দামে ফের বড় লাফ? রুপোর দাম আরও চড়া হচ্ছে? দেখে নিন আজকের রেট
১৫ সেপ্টেম্বর ২০২৬, মঙ্গলবার কলকাতায় সোনার দামে বড় লাফ দেখা যায়নি। বরং বিভিন্ন বাজারে ওঠানামা করছে হলুদ ধাতুর দাম। কলকাতায় ২৪ ক্যারেট সোনা…
