জয়শঙ্কর রাশিয়ায়, ডোভাল চিনে: ভারত কী পরিকল্পনা করছে? ব্যাখ্যা
একদিকে রাশিয়ায় বিদেশমন্ত্রী এস জয়শঙ্কর, অন্যদিকে চিনে জাতীয় নিরাপত্তা উপদেষ্টা অজিত ডোভাল। একই সময়ে দুই গুরুত্বপূর্ণ কূটনৈতিক তৎপরতা ঘিরে প্রশ্ন উঠছে—আন্তর্জাতিক রাজনীতির বদলে যাওয়া সমীকরণে ভারত কি নতুন কৌশল সাজাচ্ছে? রাশিয়ার সঙ্গে বাণিজ্য ও কৌশলগত সম্পর্ক জোরদার এবং চিনের সঙ্গে সীমান্ত উত্তেজনা কমানোর প্রচেষ্টাই আপাতত নয়াদিল্লির অন্যতম অগ্রাধিকার বলে মনে করা হচ্ছে।
লিখেছেন
Priya Jana
জয়শঙ্কর রাশিয়ায়, ডোভাল চিনে—একসঙ্গে দুই গুরুত্বপূর্ণ কূটনৈতিক পদক্ষেপ কেন?
নয়াদিল্লির বিদেশনীতি নিয়ে গুরুত্বপূর্ণ বার্তা দিচ্ছে একই সময়ে দুই উচ্চপর্যায়ের সফর। বিদেশমন্ত্রী এস জয়শঙ্কর রাশিয়ায় গিয়ে রুশ নেতৃত্বের সঙ্গে বৈঠক করছেন। অন্যদিকে জাতীয় নিরাপত্তা উপদেষ্টা অজিত ডোভাল পৌঁছেছেন বেজিংয়ে। সেখানে চিনের বিদেশমন্ত্রী তথা সীমান্ত বিষয়ক বিশেষ প্রতিনিধি ওয়াং ই-র সঙ্গে ভারত-চিন সীমান্ত নিয়ে গুরুত্বপূর্ণ বৈঠক হচ্ছে।
এই দুই সফরকে আলাদা ঘটনা হিসেবে দেখলে ছবির একটা অংশই ধরা পড়বে। কারণ, একদিকে রাশিয়ার সঙ্গে ভারতের দীর্ঘদিনের কৌশলগত সম্পর্ক, প্রতিরক্ষা ও জ্বালানি সহযোগিতা; অন্যদিকে চিনের সঙ্গে সীমান্ত স্থিতিশীলতা—দুই ক্ষেত্রেই এই মুহূর্তে নয়াদিল্লির সামনে গুরুত্বপূর্ণ স্বার্থ জড়িয়ে রয়েছে।
রাশিয়ার সঙ্গে বাণিজ্য ও কৌশলগত সম্পর্ক
জয়শঙ্করের মস্কো সফরের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ বিষয় ভারত-রাশিয়া বাণিজ্য সম্পর্ক। রাশিয়ার সঙ্গে ভারতের বাণিজ্যে বড় ধরনের ভারসাম্যহীনতা রয়েছে বলে মস্কোয় আলোচনায় বিষয়টি উঠে এসেছে। ভারতের লক্ষ্য ২০৩০ সালের মধ্যে দ্বিপাক্ষিক বাণিজ্য ১০০ বিলিয়ন ডলারে নিয়ে যাওয়া। সেই লক্ষ্যে জাতীয় মুদ্রায় লেনদেন, মুক্ত বাণিজ্য চুক্তি এবং বাণিজ্যিক বাধা কমানোর মতো বিষয় আলোচনায় গুরুত্ব পাচ্ছে।
ইউক্রেন যুদ্ধ, পশ্চিমা নিষেধাজ্ঞা এবং আন্তর্জাতিক বাণিজ্য ব্যবস্থার পরিবর্তনের মধ্যেও রাশিয়ার সঙ্গে সম্পর্ক ধরে রেখেছে ভারত। জ্বালানি নিরাপত্তা থেকে প্রতিরক্ষা—একাধিক ক্ষেত্রে মস্কো এখনও নয়াদিল্লির গুরুত্বপূর্ণ অংশীদার।
চিনে ডোভালের আসল লক্ষ্য কী?
অন্যদিকে অজিত ডোভালের বেজিং সফরের মূল কেন্দ্র ভারত-চিন সীমান্ত সমস্যা। ২৫তম দফার Special Representatives বা বিশেষ প্রতিনিধি পর্যায়ের বৈঠকে ডোভাল এবং ওয়াং ই সীমান্ত প্রশ্ন নিয়ে আলোচনা করছেন। এই ব্যবস্থা ২০০৩ সালে তৈরি হয়েছিল দুই দেশের দীর্ঘদিনের সীমান্ত বিরোধ নিয়ে আলোচনার জন্য।
২০২০ সালের গালওয়ান সংঘর্ষের পর ভারত-চিন সম্পর্ক দীর্ঘ সময় ধরে অত্যন্ত চাপের মধ্যে ছিল। পরবর্তী সময়ে সামরিক ও কূটনৈতিক স্তরে একাধিক আলোচনার মাধ্যমে পরিস্থিতি কিছুটা স্থিতিশীল করার চেষ্টা হয়েছে। কিন্তু সীমান্ত প্রশ্ন এখনও পুরোপুরি মীমাংসিত নয়।
ডোভালের বৈঠকের তাৎপর্য এখানেই। সীমান্তে শান্তি ও স্থিতাবস্থা বজায় রাখা ভারত-চিন সম্পর্ক স্বাভাবিক করার অন্যতম শর্ত। ফলে বেজিংয়ে ডোভালের আলোচনায় সীমান্তের পাশাপাশি দুই দেশের সামগ্রিক সম্পর্ক এবং আঞ্চলিক ও আন্তর্জাতিক পরিস্থিতিও গুরুত্ব পেতে পারে।
সামনে BRICS, তাই প্রস্তুতিও গুরুত্বপূর্ণ
এই দুই সফরের সময়টিও অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ। আগামী মাসে ভারতে BRICS শীর্ষ সম্মেলন হওয়ার কথা। সেই সম্মেলনে চিনের প্রেসিডেন্ট শি জিনপিংয়ের সম্ভাব্য সফর নিয়েও কূটনৈতিক মহলে জল্পনা রয়েছে। তার আগে ভারত-চিন সম্পর্কের বর্তমান পরিস্থিতি এবং সীমান্তে স্থিতিশীলতা নিয়ে আলোচনা আরও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে।
অর্থাৎ, ডোভালের বেজিং সফরকে শুধু সীমান্ত বৈঠক হিসেবে দেখলে ভুল হবে। সম্ভাব্য উচ্চপর্যায়ের ভারত-চিন বৈঠকের আগে দুই দেশের মধ্যে যোগাযোগের পরিবেশ তৈরি করাও এর অন্যতম উদ্দেশ্য হতে পারে।
ভারত কি রাশিয়া ও চিন—দুই দিকেই ভারসাম্য তৈরি করছে?
বর্তমান ভূরাজনৈতিক পরিস্থিতিতে ভারতের সামনে সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জগুলির একটি হল একাধিক শক্তির সঙ্গে একইসঙ্গে সম্পর্ক বজায় রাখা। রাশিয়া ভারতের পুরনো কৌশলগত অংশীদার। আবার চিন এশিয়ার অন্যতম প্রধান শক্তি এবং ভারতের গুরুত্বপূর্ণ প্রতিবেশী ও প্রতিদ্বন্দ্বী।
এই পরিস্থিতিতে নয়াদিল্লির কৌশলকে ‘স্ট্র্যাটেজিক অটোনমি’ বা কৌশলগত স্বায়ত্তশাসনের ধারাবাহিকতা হিসেবে দেখা যেতে পারে। অর্থাৎ কোনও একটি শক্তির সঙ্গে সম্পর্ককে কেন্দ্র করে পুরো বিদেশনীতি নির্ধারণ না করে, দেশের স্বার্থ অনুযায়ী বিভিন্ন শক্তির সঙ্গে পৃথকভাবে যোগাযোগ রাখা।
রাশিয়ার ক্ষেত্রে ভারতের লক্ষ্য হতে পারে জ্বালানি, প্রতিরক্ষা, বাণিজ্য এবং অর্থনৈতিক সহযোগিতা আরও মজবুত করা। চিনের ক্ষেত্রে অগ্রাধিকার সীমান্তে শান্তি বজায় রাখা এবং দ্বিপাক্ষিক সম্পর্ককে নিয়ন্ত্রিত পথে এগিয়ে নেওয়া।
আমেরিকার সঙ্গে সমীকরণও গুরুত্বপূর্ণ
এই কূটনৈতিক তৎপরতার আরেকটি প্রেক্ষাপট রয়েছে। আন্তর্জাতিক বাণিজ্য ও কৌশলগত সমীকরণ দ্রুত বদলাচ্ছে। ফলে ভারতের পক্ষে কোনও একটি দেশের উপর অতিরিক্ত নির্ভরশীল না হয়ে একাধিক শক্তির সঙ্গে যোগাযোগ বজায় রাখা গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে।
বিশেষ করে রাশিয়ার সঙ্গে ভারতের সম্পর্ক নিয়ে পশ্চিমা চাপ থাকলেও নয়াদিল্লি বারবার নিজেদের জাতীয় স্বার্থ এবং কৌশলগত স্বায়ত্তশাসনের কথা তুলে ধরেছে। একইসঙ্গে চিনের সঙ্গে সীমান্ত সমস্যা থাকলেও আলোচনার পথ খোলা রেখেছে ভারত।
তাহলে ভারতের পরিকল্পনা কী?
এখনও পর্যন্ত এমন কোনও সরকারি ঘোষণা নেই যে ভারত রাশিয়া ও চিনকে ঘিরে কোনও নতুন জোট বা বড় কৌশলগত পুনর্বিন্যাস করতে চলেছে। বরং বর্তমান ঘটনাপ্রবাহ থেকে যে ছবি পাওয়া যাচ্ছে তা হল—নয়াদিল্লি একই সময়ে একাধিক কূটনৈতিক ফ্রন্ট সক্রিয় রাখছে।
রাশিয়ার সঙ্গে অর্থনীতি, বাণিজ্য, জ্বালানি ও কৌশলগত সম্পর্ক এগিয়ে নেওয়া; চিনের সঙ্গে সীমান্তে শান্তি ও যোগাযোগ বজায় রাখা; এবং BRICS-এর মতো বহুপাক্ষিক মঞ্চে নিজের অবস্থান শক্তিশালী করা—এই তিনটি স্তরকে একই বৃহত্তর কৌশলের অংশ হিসেবে দেখা যেতে পারে।
সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হল, ভারত কোনও একটি শক্তির সঙ্গে সম্পর্কের উপর নিজের কৌশলগত সিদ্ধান্তকে নির্ভরশীল করতে চাইছে না। জয়শঙ্করের মস্কো সফর এবং ডোভালের বেজিং সফর সেই বহুমুখী কূটনীতিরই একটি গুরুত্বপূর্ণ উদাহরণ।
Keep reading
More in আন্তর্জাতিক
আন্তর্জাতিক
চীনা পণ্যে ৭.৫% শুল্ক বসাতে পারে আমেরিকা, ট্রাম্প-শি বৈঠকের আগে বড় ধাক্কার আশঙ্কা
ট্রাম্প-শি জিনপিং বৈঠকের আগে চীনা পণ্যের উপর অতিরিক্ত ৭.৫ শতাংশ শুল্ক আরোপের কথা বিবেচনা করছে মার্কিন প্রশাসন। অতিরিক্ত উৎপাদন ক্ষমতা ও কম দ…
আন্তর্জাতিক
হিলারি ক্লিনটনের বড় মন্তব্য: মার্কিন-ইরান যুদ্ধ থামাতে ভারত ও চীনই কি চাবিকাঠি?
মার্কিন-ইরান সংঘাতের অবসানের ক্ষেত্রে ভারত ও চীন গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা নিতে পারে বলে মন্তব্য করেছেন প্রাক্তন মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী হিলারি ক…
আন্তর্জাতিক
India-ইউরোপ সম্পর্ক: নতুন বিশ্বব্যবস্থায় সমান অংশীদারিত্বের সময়
বিশ্ব রাজনীতিতে দ্রুত বদল আসছে। রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধ, যুক্তরাষ্ট্র-চিন প্রতিদ্বন্দ্বিতা, সরবরাহ শৃঙ্খলের অনিশ্চয়তা এবং নতুন ভূরাজনৈতিক সমীকর…
আন্তর্জাতিক
Northern Sea Route Explained: আর্কটিকের বরফ গললে বিশ্ব বাণিজ্যে কী বদল, ভারতের লাভ কোথায়?
আর্কটিক অঞ্চলের বরফ গলার সঙ্গে সঙ্গে নর্দার্ন সি রুট বা Northern Sea Route নিয়ে বিশ্বজুড়ে আগ্রহ বাড়ছে। রাশিয়ার উত্তর উপকূল ঘেঁষে চলা এই সম…
আন্তর্জাতিক
সৌদিতে হুথি হামলা, ইজরায়েলের নিশানায় তুরস্ক: মক্কা চুক্তি কোথায়?
৭ আগস্ট ২০২৬ সৌদি আরব, তুরস্ক ও পাকিস্তান মক্কায় যৌথ প্রতিরক্ষা চুক্তি স্বাক্ষর করে। চুক্তিতে বলা হয়েছে, তিন দেশের কোনও একটির উপর সশস্ত্র হা…
আন্তর্জাতিক
ভারত-রাশিয়া বাণিজ্য ১০০ বিলিয়ন ডলারের লক্ষ্যে, ভারসাম্যহীনতা নিয়ে বার্তা জয়শঙ্করের
ভারত ও রাশিয়া দ্বিপাক্ষিক বাণিজ্য ১০০ বিলিয়ন মার্কিন ডলারে পৌঁছে দেওয়ার লক্ষ্যে এগোচ্ছে। তবে বাণিজ্যের বর্তমান কাঠামোয় ভারসাম্যহীনতা রয়েছে ব…
