শত্রুরূপে চিহ্নিত বই: রাজনৈতিক সংঘাতের নিশানায় সংস্কৃতি ও মতপ্রকাশের স্বাধীনতা
পশ্চিমবঙ্গে রাজনৈতিক পালাবদলের পর ক্লাব, পুজো কমিটি ও পার্টি অফিসের দখল নিয়ে বিতর্ক নতুন নয়। তবে এ বার দুর্গাপুজোর সময় বিরোধী মতাদর্শের বইয়ের স্টল ভাঙচুর, বই ছিঁড়ে ফেলা ও পুড়িয়ে দেওয়ার অভিযোগ ঘিরে তীব্র বিতর্ক তৈরি হয়েছে। যাদবপুরে বইয়ের স্টল ভাঙার প্রতিবাদে নাগরিকদের একাংশ পথে নামেন। এই ঘটনা রাজনৈতিক অসহিষ্ণুতা, সাংস্কৃতিক স্বাধীনতা এবং গণতান্ত্রিক পরিসরে ভিন্নমতের অধিকার নিয়ে নতুন করে প্রশ্ন তুলেছে।
লিখেছেন
Priya Jana

রাজনৈতিক পালাবদল ও দখলের রাজনীতি
পশ্চিমবঙ্গের রাজনীতিতে ক্ষমতার পরিবর্তনের সঙ্গে বিভিন্ন স্থানীয় প্রতিষ্ঠান ও সম্পত্তির নিয়ন্ত্রণ নিয়ে সংঘাতের অভিযোগ দীর্ঘদিনের। পাড়ার ক্লাব, দুর্গাপুজোর কমিটি, রাজনৈতিক কার্যালয় কিংবা রিকশা ও অটো স্ট্যান্ডের দখল নিয়ে বিভিন্ন সময়ে বিতর্ক তৈরি হয়েছে। কিন্তু এ বার রাজনৈতিক বিরোধের কেন্দ্রে উঠে এসেছে বই—বিশেষত বামপন্থী ও ভিন্ন মতাদর্শের বইয়ের স্টল।
২০২৬ সালের দুর্গাপুজোর সময় রাজ্যের বিভিন্ন জায়গায় রাজনৈতিক বিরোধীদের বইয়ের স্টল ভাঙচুর করা, স্টল বসাতে বাধা দেওয়া এবং বই নষ্ট করার অভিযোগ সামনে আসে। কোথাও বই ছুড়ে ফেলা, ছিঁড়ে ফেলা কিংবা পুড়িয়ে দেওয়ার দৃশ্য সমাজমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ে। এর ফলে বইয়ের স্টলকে ঘিরে বিতর্ক আর শুধু রাজনৈতিক দলের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকেনি; তা মতপ্রকাশের স্বাধীনতা ও সাংস্কৃতিক অধিকার নিয়ে বৃহত্তর আলোচনার জন্ম দিয়েছে।
যাদবপুরে বইয়ের স্টল ভাঙা নিয়ে বিতর্ক
বইয়ের স্টল ভাঙার ঘটনাকে কেন্দ্র করে যাদবপুরে বিশেষভাবে উত্তেজনা তৈরি হয়। অভিযোগ অনুযায়ী, সেখানে বামপন্থী মতাদর্শের বইয়ের স্টল ভাঙতে বুলডোজ়ার ব্যবহার করা হয় এবং বই সরিয়ে নেওয়ার ঘটনাও বিতর্কের জন্ম দেয়। এর প্রতিবাদে ১৮ অক্টোবর নাগরিক মিছিল বের হয়। বিভিন্ন রাজনৈতিক মতের মানুষ সেই প্রতিবাদে অংশ নেন বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
প্রতিবাদীদের বক্তব্য, বইয়ের সঙ্গে মতাদর্শগত মতভেদ থাকতে পারে, কিন্তু সেই কারণে বই নষ্ট করা বা বই বিক্রির অধিকার কেড়ে নেওয়া গণতান্ত্রিক সংস্কৃতির পরিপন্থী। অন্যদিকে, এ ধরনের ঘটনার রাজনৈতিক ব্যাখ্যা নিয়ে বিতর্কও চলেছে। তবে যে মতেরই বই হোক, তা নিয়ে আপত্তি থাকলে যুক্তি ও আলোচনার পথ খোলা রাখাই গণতান্ত্রিক সমাজের প্রত্যাশা।
বই কি রাজনৈতিক শত্রু?
বই কেবল তথ্য বা বিনোদনের মাধ্যম নয়; সমাজ, ইতিহাস, রাজনীতি ও দর্শন সম্পর্কে মানুষের চিন্তাভাবনা গড়ে তুলতেও বই গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। বিশেষত রাজনৈতিক মতাদর্শের বই পাঠকের সামনে বিকল্প ব্যাখ্যা ও প্রশ্ন তুলে ধরতে পারে। সেই কারণেই বইয়ের স্টল ভাঙচুরের ঘটনাকে ঘিরে সমালোচকদের একাংশের আশঙ্কা, ভিন্নমতকে অগ্রহণযোগ্য হিসেবে চিহ্নিত করার প্রবণতা আরও জোরদার হচ্ছে।
বিতর্কের কেন্দ্রে রয়েছে একটি মৌলিক প্রশ্ন—কোনও বইয়ের বক্তব্য অপছন্দ হলে তার মোকাবিলা কীভাবে করা হবে? গণতান্ত্রিক ব্যবস্থায় মতাদর্শের বিরোধিতা, সমালোচনা এবং পাল্টা যুক্তি দেওয়ার অধিকার রয়েছে। কিন্তু বই ছিঁড়ে ফেলা বা স্টল ভেঙে দেওয়া সেই আলোচনার বিকল্প হতে পারে না।
প্রতিবাদে বইয়ের পাশে নাগরিকেরা
যাদবপুরে বইয়ের স্টল ভাঙার ঘটনার প্রতিবাদে নাগরিকদের একাংশ পথে নামেন। প্রতিবাদী কর্মসূচিতে বই কেনা ও বইয়ের স্টলের পাশে দাঁড়ানোর ঘটনাও সামনে আসে। এর ফলে বিতর্কের অন্য একটি দিক প্রকাশ পায়—কোনও বই বা মতাদর্শকে দমিয়ে রাখার চেষ্টা হলে তার বিরুদ্ধে নাগরিক প্রতিরোধও গড়ে উঠতে পারে।
এই ঘটনায় রাজনৈতিক অবস্থান নির্বিশেষে মতপ্রকাশের স্বাধীনতার প্রশ্নটি গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে। কারণ আজ যে মতাদর্শের বই আক্রান্ত হচ্ছে, আগামী দিনে অন্য কোনও মতের বইও একই পরিস্থিতির মুখে পড়তে পারে। তাই বইয়ের স্বাধীনতা রক্ষা করা কোনও একটি রাজনৈতিক দলের স্বার্থের বিষয় নয়; এটি বৃহত্তর গণতান্ত্রিক অধিকার।
প্রশাসনের ভূমিকা নিয়ে প্রশ্ন
বইয়ের স্টল ভাঙচুরের অভিযোগকে ঘিরে প্রশাসনের ভূমিকা নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে। আইনশৃঙ্খলা রক্ষা, নাগরিকের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা এবং শান্তিপূর্ণভাবে মতপ্রকাশের সুযোগ বজায় রাখা প্রশাসনের গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব। কোনও বইয়ের স্টল আইনবিরুদ্ধভাবে স্থাপিত হয়েছে বলে অভিযোগ থাকলে, তার নিষ্পত্তি হওয়া উচিত আইন ও নির্ধারিত প্রশাসনিক প্রক্রিয়া মেনে।
একই সঙ্গে রাজনৈতিক কর্মসূচি ও জনসমাগমের ক্ষেত্রে প্রশাসনের অগ্রাধিকার নিয়েও বিতর্ক দেখা দিয়েছে। সমালোচকদের বক্তব্য, বইয়ের স্টল ভাঙার মতো ঘটনায় প্রশাসনিক তৎপরতা এবং বড় জনসমাগমে নিরাপত্তার ব্যবস্থার মধ্যে সামঞ্জস্য থাকা জরুরি। অভিযোগের সত্যতা নির্ধারণ এবং দায়িত্ব নিরূপণের জন্য নিরপেক্ষ তদন্ত ও প্রমাণভিত্তিক মূল্যায়ন গুরুত্বপূর্ণ।
ইতিহাসের শিক্ষা ও গণতন্ত্রের ভবিষ্যৎ
ইতিহাসে বিভিন্ন সময়ে বই নিষিদ্ধ করা, বই পুড়িয়ে দেওয়া কিংবা নির্দিষ্ট মতাদর্শের সাহিত্যকে দমন করার চেষ্টা দেখা গিয়েছে। কিন্তু বইয়ের বিষয়বস্তু নিয়ে বিতর্কের সমাধান বই ধ্বংসের মাধ্যমে হয় না। বরং স্বাধীন পাঠ, যুক্তিনির্ভর আলোচনা এবং ভিন্নমতের সঙ্গে পরিচিত হওয়ার সুযোগ সমাজকে আরও সমৃদ্ধ করে।
পশ্চিমবঙ্গের সাম্প্রতিক বইয়ের স্টল বিতর্ক তাই একটি বৃহত্তর প্রশ্ন সামনে এনেছে: রাজনৈতিক মতভেদ কি সাংস্কৃতিক পরিসরকেও দখলের লড়াইয়ে পরিণত করবে, নাকি বই ও চিন্তার স্বাধীনতা সব পক্ষের কাছেই সমানভাবে গুরুত্বপূর্ণ থাকবে?
উপসংহার
রাজনৈতিক ক্ষমতার পরিবর্তন গণতন্ত্রের স্বাভাবিক প্রক্রিয়া। কিন্তু সেই পরিবর্তনের সঙ্গে ভিন্ন মতের মানুষ, তাদের সাংস্কৃতিক উদ্যোগ কিংবা বইয়ের স্বাধীনতার উপর আঘাত নেমে আসা গণতান্ত্রিক মূল্যবোধের জন্য উদ্বেগজনক। বইয়ের বক্তব্যের সঙ্গে দ্বিমত থাকলে তার জবাব দেওয়া যায় যুক্তি, আলোচনা ও পাল্টা লেখার মাধ্যমে। বইকে শত্রু হিসেবে চিহ্নিত করে ধ্বংস করার প্রবণতা সমাজে সহিষ্ণুতা ও মুক্তচিন্তার পরিসরকে সংকুচিত করতে পারে।
Keep reading
More in নিউজ
নিউজ
কালীপুজোর আগে সবুজ বাজির পরীক্ষা ৩০ অক্টোবর, নিরাপত্তায় জোর
কালীপুজোর আগে সবুজ বাজির গুণমান যাচাই এবং বাজির বাজারে নিরাপত্তা নিশ্চিত করার বিষয়ে গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে। ৩০ অক্টোবর সবুজ বাজির নমুনা পরীক্ষা…
.jpg&w=3840&q=75)
নিউজ
শ্রীযোগেন চৌধুরী (১৯৩৯–২০২৬): অসুস্থতার আড়ালেও সৃষ্টির সাধনা
প্রয়াত বিশিষ্ট চিত্রশিল্পী যোগেন চৌধুরীর জীবন ও শিল্প যেন সৃষ্টির প্রতি অবিচল নিষ্ঠার এক অনন্য উদাহরণ। জীবনের শেষ পর্বে গুরুতর অসুস্থতার সঙ…

নিউজ
সীমান্ত উদ্বেগ: চিনের সঙ্গে সংঘাতের ইতিহাস, আশ্বাসেই কি কাটবে আশঙ্কা?
ভারত ও চিনের সীমান্ত বিরোধ দীর্ঘদিনের। প্রকৃত নিয়ন্ত্রণরেখা বা এলএসি-র অবস্থান নিয়ে দুই দেশের মধ্যে মতপার্থক্য, টহলদারি নিয়ে সংঘাত এবং সা…
.jpg&w=3840&q=75)
নিউজ
সাফল্যের আড়ালে: ভারতের জঙ্গলে চিতাদের দীর্ঘমেয়াদি বাসস্থান কি সত্যিই প্রস্তুত?
আফ্রিকা থেকে চিতা এনে ভারতের জঙ্গলে পুনর্বাসনের উদ্যোগ ‘প্রজেক্ট চিতা’ জন্ম দিয়েছে নতুন আশার। চিতাদের বংশবৃদ্ধি এবং ভারতীয় পরিবেশে মানিয়ে…
.jpg&w=3840&q=75)
নিউজ
বর্ধমান মেডিক্যালের ফেস্টে ৫৫০০ টাকা চাঁদা দাবি! চিকিৎসক সংগঠনের নাম করে চাপ দেওয়ার অভিযোগে বিতর্ক
বর্ধমান মেডিক্যাল কলেজের ফেস্টকে কেন্দ্র করে ৫৫০০ টাকা চাঁদা দাবি করার অভিযোগ উঠেছে। একটি চিকিৎসক সংগঠনের নাম করে চাপ দেওয়া হয়েছে বলেও অভিযো…
.jpg&w=3840&q=75)
নিউজ
অন্য রোগীরাও কর্পোরেট হাসপাতালে যেতে চাইলে ‘প্রোটোকল’ কী হবে? চোরবাগান প্রসঙ্গে প্রশ্ন জুনিয়র ডাক্তারদের সংগঠনের
চোরবাগান সংক্রান্ত ঘটনায় কর্পোরেট হাসপাতালে চিকিৎসা নেওয়ার বিষয়টি ঘিরে প্রশ্ন তুলেছে জুনিয়র ডাক্তারদের সংগঠন। অন্য রোগীরাও যদি একই ভাবে কর্প…
