অভিষেকের ক্যামাক স্ট্রিটের অফিস নিয়ে বিরাট খবর, ‘জবরদখল’-এর অভিযোগ বাড়ির মালিকের! আইনি নোটিসে চাপে কালীঘাটের তৃণমূল
ক্যামাক স্ট্রিটে অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়ের দফতর ঘিরে বিতর্ক আরও তীব্র। এবার বাড়ির মালিকপক্ষের অভিযোগ, ২০২০ সালের চুক্তির শর্ত ভেঙে ভবনের দুটি তলা অনুমতি ছাড়াই ব্যবহার করা হচ্ছে। তৃণমূল যুব কংগ্রেসকে আইনি নোটিস পাঠিয়ে জায়গা খালি করার দাবি জানানো হয়েছে। এর মধ্যেই হোর্ডিং-কাণ্ডে পুলিশি তদন্ত ও এফআইআর ঘিরে চাপ বাড়ছে তৃণমূলের অন্দরে।
লিখেছেন
Priya Jana

কলকাতা: ক্যামাক স্ট্রিটে তৃণমূলের সর্বভারতীয় সাধারণ সম্পাদক তথা ডায়মন্ড হারবারের সাংসদ অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়ের অফিস ঘিরে বিতর্ক যেন থামছেই না। বেআইনি হোর্ডিং সরানোকে কেন্দ্র করে পুলিশের সঙ্গে সংঘর্ষ, এফআইআর এবং অভিষেককে জিজ্ঞাসাবাদের পর এবার সামনে এল অফিসের জায়গা ব্যবহার নিয়ে বাড়ির মালিকপক্ষের অভিযোগ।
মালিকপক্ষের দাবি, ২০২০ সালে ৯ নম্বর ক্যামাক স্ট্রিটের ভবনটি ব্যবহারের জন্য তৃণমূল যুব কংগ্রেসের সঙ্গে যে চুক্তি হয়েছিল, তার শর্ত মানা হয়নি। এমনকি চুক্তির আওতার বাইরে গিয়ে ভবনের দুটি তলা দখল করে রাখা হয়েছে বলেও অভিযোগ করা হয়েছে। এই অভিযোগে তৃণমূলকে আইনি নোটিস পাঠানো হয়েছে।
ঠিক কী অভিযোগ বাড়ির মালিকের?
বাড়ির মালিক রমা দেবী গোয়েঙ্কার তরফে অভিযোগ করা হয়েছে, ২০২০ সালে তৃণমূল যুব কংগ্রেসের সঙ্গে ভবন ব্যবহারের বিষয়ে চুক্তি হয়েছিল। সেই চুক্তিতে যে পরিমাণ জায়গা ব্যবহারের কথা ছিল, তার বাইরে গিয়ে অফিসের জন্য আরও অংশ ব্যবহার করা হচ্ছে বলে অভিযোগ।
মালিকপক্ষের দাবি, প্রয়োজনীয় Completion Certificate (CC) নিয়েও বারবার বলা হয়েছিল। কিন্তু সেটি ছাড়াই প্রভাব খাটিয়ে ভবনের দুটি তলা ব্যবহার করা হয়েছে বলে অভিযোগ উঠেছে। পাশাপাশি মালিকের অনুমতি ছাড়াই ভবনের উপরে বড় হোর্ডিং ও লোহার কাঠামো বসানোর অভিযোগও রয়েছে।
তবে এগুলি বাড়ির মালিকপক্ষের অভিযোগ। আদালতের চূড়ান্ত রায়ে অভিযোগগুলি প্রমাণিত হয়েছে—এমন দাবি এখনও করা যায় না।
হোর্ডিং-কাণ্ড থেকেই নতুন করে জলঘোলা
ক্যামাক স্ট্রিটের অফিস নিয়ে নতুন অভিযোগ সামনে আসার পিছনে রয়েছে সাম্প্রতিক হোর্ডিং বিতর্ক। গত ২৭ আগস্ট কলকাতা পুরসভার আধিকারিকরা পুলিশের সঙ্গে গিয়ে অভিষেকের অফিসের ছাদে থাকা তৃণমূলের একটি বড় হোর্ডিং সরানোর উদ্যোগ নেন।
পুরসভার দাবি ছিল, হোর্ডিংটি নিয়মবহির্ভূত। হোর্ডিং সরানোর সময় তৃণমূল কর্মী-সমর্থকদের সঙ্গে পুলিশ ও পুরকর্মীদের উত্তেজনা তৈরি হয়। পরিস্থিতি পরে ধস্তাধস্তিতে পৌঁছয়।
ঘটনার পর অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায় পুরসভার অভিযানের বৈধতা নিয়ে প্রশ্ন তোলেন। তাঁর অভিযোগ ছিল, যথাযথ লিখিত নির্দেশ বা নোটিস ছাড়াই অফিসে প্রবেশের চেষ্টা করা হয়েছিল। অন্যদিকে প্রশাসনের বক্তব্য, বেআইনি হোর্ডিং সরানোর জন্যই অভিযান চালানো হয়েছিল।
তিনটি FIR, গ্রেফতার ১৪
হোর্ডিং সরানোকে কেন্দ্র করে তৈরি হওয়া উত্তেজনার ঘটনায় কলকাতা পুলিশের তরফে তিনটি FIR দায়ের করা হয়েছে। অভিযোগের মধ্যে রয়েছে সরকারি কাজে বাধা, পুলিশকর্মীদের সঙ্গে ধস্তাধস্তি এবং এক মহিলা আধিকারিককে হেনস্থার চেষ্টার মতো অভিযোগ।
এই ঘটনায় ১৪ জনকে গ্রেফতার করা হয়েছে বলে সর্বশেষ রিপোর্টে জানা গিয়েছে। অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায় এবং তৃণমূলের রাজ্যসভার সাংসদ ডেরেক ও'ব্রায়েনের নামও তদন্তের আওতায় এসেছে।
অভিষেককে ১ সেপ্টেম্বর শেক্সপিয়ার সরণি থানায় হাজির হতে বলা হয়েছিল। পরবর্তীতে তিনি সেখানে গিয়ে দীর্ঘ সময় পুলিশের জিজ্ঞাসাবাদের মুখোমুখি হন।
এবার অফিস খালি করার নোটিস
হোর্ডিং-কাণ্ডের উত্তাপের মধ্যেই বাড়ির মালিকপক্ষের তরফে অফিসের জায়গা খালি করার আইনি নোটিস পাঠানো হয়েছে। মালিকপক্ষের বক্তব্য, চুক্তির শর্ত লঙ্ঘন করে জায়গাটি ব্যবহার করা হচ্ছে। নোটিসের পরেও ব্যবস্থা না নেওয়া হলে আইনানুগ পথে এগোনোর কথাও জানানো হয়েছে।
অর্থাৎ, একই অফিসকে ঘিরে এখন দুটি পৃথক আইনি বিষয় সামনে এসেছে—একদিকে হোর্ডিং সরানোকে কেন্দ্র করে পুলিশের মামলা, অন্যদিকে ভবন ব্যবহারের অধিকার নিয়ে মালিকপক্ষের অভিযোগ।
কালীঘাটের তৃণমূলের জন্য কেন গুরুত্বপূর্ণ?
ক্যামাক স্ট্রিটের অফিসটি তৃণমূলের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ রাজনৈতিক কর্মকেন্দ্র হিসেবে পরিচিত। ফলে এই দফতরকে ঘিরে একের পর এক আইনি জটিলতা তৈরি হওয়ায় রাজনৈতিক মহলে স্বাভাবিকভাবেই চর্চা শুরু হয়েছে।
বিশেষ করে মালিকপক্ষের ‘জবরদখল’-এর অভিযোগ প্রকাশ্যে আসায় বিতর্ক আরও বাড়ল। যদিও তৃণমূলের তরফে এই অভিযোগের আইনি অবস্থান নিয়ে পাল্টা বক্তব্য রয়েছে এবং গোটা বিষয়টির নিষ্পত্তি শেষ পর্যন্ত আদালত ও সংশ্লিষ্ট আইনি প্রক্রিয়াতেই হবে।
অভিষেকের পাল্টা অবস্থান কী?
হোর্ডিং-কাণ্ডে অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায় ইতিমধ্যেই প্রশাসনের পদক্ষেপের বিরুদ্ধে সরব হয়েছেন। তাঁর অভিযোগ, রাজনৈতিক উদ্দেশ্যেই পুলিশ ও পুরসভাকে ব্যবহার করা হচ্ছে।
অন্যদিকে, কলকাতা পুলিশ ও পুরসভার বক্তব্য সম্পূর্ণ আলাদা। তাঁদের দাবি, বেআইনি হোর্ডিং সরানো এবং সরকারি কাজে বাধা দেওয়ার অভিযোগের ভিত্তিতেই আইনানুগ পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে। পুলিশ তদন্তে CCTV ফুটেজ-সহ বিভিন্ন তথ্য খতিয়ে দেখছে।
আগামী দিনে কী হতে পারে?
এখন নজর থাকবে বাড়ির মালিকপক্ষের আইনি নোটিসের পর তৃণমূল কী পদক্ষেপ করে এবং প্রয়োজন হলে বিষয়টি আদালতে গড়ায় কি না। পাশাপাশি হোর্ডিং-কাণ্ডে দায়ের হওয়া মামলাগুলির তদন্তও চলবে।
এরই মধ্যে আরও একটি বিষয় সামনে এসেছে। ২ সেপ্টেম্বর অভিষেকের ক্যামাক স্ট্রিটের অফিসকে অগ্নিনিরাপত্তা সংক্রান্ত নোটিসও দেওয়া হয়েছে বলে রিপোর্ট প্রকাশিত হয়েছে। ওই নোটিসে কথিত নিরাপত্তাজনিত ত্রুটি এবং মেয়াদোত্তীর্ণ ফায়ার সার্টিফিকেট নিয়ে জবাব চাওয়া হয়েছে।
সব মিলিয়ে, একের পর এক অভিযোগ ও প্রশাসনিক পদক্ষেপে ক্যামাক স্ট্রিটের অফিস এখন তৃণমূলের জন্য নতুন করে আইনি চাপের কেন্দ্রবিন্দুতে। তবে বাড়ির মালিকের জবরদখলের অভিযোগ এখনও অভিযোগের পর্যায়েই রয়েছে; আদালতের চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত না হওয়া পর্যন্ত সেটিকে প্রতিষ্ঠিত সত্য হিসেবে দেখা উচিত নয়।
Keep reading
More in রাজনীতি
রাজনীতি
কলকাতার চোরবাগান পদপিষ্ট: মৃতের পরিবারকে ২৭ লক্ষ টাকা ক্ষতিপূরণ
কলকাতার চোরবাগান সর্বজনীন দুর্গাপুজো মণ্ডপে পদপিষ্টের ঘটনায় মৃত শুভম সোনকরের পরিবারের পাশে দাঁড়ালেন পশ্চিমবঙ্গের মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিক…
রাজনীতি
রাহুল গান্ধীকে ‘ফেলড প্রোডাক্ট’ কটাক্ষ মোদীর, পাল্টা শশী থারুর
প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদীর ‘ফেলড প্রোডাক্ট’ মন্তব্যকে ঘিরে নতুন করে সরগরম জাতীয় রাজনীতি। কংগ্রেস নেতা রাহুল গান্ধীকে নিশানা করে মোদীর কটা…
রাজনীতি
স্টোল থেকে একই মঞ্চে: রাজনৈতিক টানাপোড়েন পেরিয়েও মমতা-সোনিয়ার সম্পর্ক
দিল্লিতে INDIA ব্লকের সাম্প্রতিক বৈঠকে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় ও সোনিয়া গান্ধীর উষ্ণ মুহূর্ত ফের নজর কেড়েছে। মমতা সোনিয়াকে পশ্চিমবঙ্গ থেকে আনা…

রাজনীতি
Gyanesh Kumar ও SIR ইস্যুতে ৪ অক্টোবর মুম্বইয়ে প্রতিবাদ মিছিল, যোগ দেবে NCP-SP ও কংগ্রেস
মুখ্য নির্বাচন কমিশনার জ্ঞানেশ কুমার এবং ভোটার তালিকার Special Intensive Revision (SIR)-কে ঘিরে বিতর্কের মধ্যে ৪ অক্টোবর মুম্বইয়ে প্রস্তাবিত…
রাজনীতি
কর্ণাটকে SIR নিয়ে নতুন বিতর্ক, Form 7-এ ভোটার বাদ দেওয়ার তথ্য চাইলেন শিবকুমার
কর্ণাটকে চলা Special Intensive Revision (SIR) নিয়ে বিতর্কের মধ্যেই মুখ্যমন্ত্রী ডি কে শিবকুমার Form 7-এর মাধ্যমে ভোটারদের নাম বাদ দেওয়ার আবে…
রাজনীতি
‘ইস্তফা জনতা পার্টি’ কটাক্ষ রামদাস আঠাওয়ালের, CEC জ্ঞানেশ কুমারের পদত্যাগের দাবি ঘিরে বিতর্ক
CEC জ্ঞানেশ কুমারের পদত্যাগের দাবিকে কেন্দ্র করে রাজনৈতিক চাপানউতোরের মধ্যে CJP-কে ‘ইস্তফা জনতা পার্টি’ বলে কটাক্ষ করেছেন কেন্দ্রীয় মন্ত্রী…
