বিহার-ঝাড়খণ্ডের ২৫ বছরের জলবিবাদ মিটল, সোন নদীর নতুন চুক্তিতে কী বদলাবে?
প্রায় ২৫ বছর ধরে চলা সোন নদীর জলবণ্টন বিবাদের অবসান ঘটাল বিহার ও ঝাড়খণ্ড। ৩১ আগস্ট ২০২৬ নয়াদিল্লিতে দুই রাজ্যের মধ্যে একটি Memorandum of Understanding বা MoU স্বাক্ষরিত হয়েছে। চুক্তি অনুযায়ী সোন নদীর মোট ৭.৭৫ মিলিয়ন একর-ফুট (MAF) জলের মধ্যে বিহার পাবে ৫.৭৫ MAF এবং ঝাড়খণ্ড পাবে ২ MAF। এই চুক্তির ফলে দুই রাজ্যের কৃষি, সেচ ও পানীয় জলের ব্যবস্থাপনায় গুরুত্বপূর্ণ পরিবর্তন আসতে পারে।
লিখেছেন
Priya Jana
২৫ বছরের জলবিবাদের অবসান, সোন নদীর জল ভাগাভাগিতে বিহার-ঝাড়খণ্ডের ঐতিহাসিক চুক্তি
নয়াদিল্লি: দীর্ঘ ২৫ বছর ধরে চলা বিহার ও ঝাড়খণ্ডের সোন নদীর জলবণ্টন সংক্রান্ত বিরোধের অবসান ঘটল। সোমবার, ৩১ আগস্ট নয়াদিল্লিতে দুই রাজ্যের মধ্যে সোন নদীর জল ভাগাভাগি নিয়ে গুরুত্বপূর্ণ একটি সমঝোতাপত্র বা MoU স্বাক্ষরিত হয়েছে। কেন্দ্রের উপস্থিতিতে হওয়া এই চুক্তিকে পূর্ব ভারতের আন্তঃরাজ্য জলবণ্টন ব্যবস্থায় একটি গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ হিসেবে দেখা হচ্ছে।
চুক্তি স্বাক্ষরের সময় উপস্থিত ছিলেন কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী অমিত শাহ, জলশক্তিমন্ত্রী সি আর পাটিল, বিহারের মুখ্যমন্ত্রী সম্রাট চৌধুরী এবং ঝাড়খণ্ডের মুখ্যমন্ত্রী হেমন্ত সোরেন-সহ কেন্দ্র ও দুই রাজ্যের শীর্ষ আধিকারিকরা।
কী রয়েছে নতুন সোন নদীর জলবণ্টন চুক্তিতে?
মূল বিষয় হল, অবিভক্ত বিহারের জন্য ১৯৭৩ সালের বাণসাগর চুক্তিতে বরাদ্দ করা ৭.৭৫ মিলিয়ন একর-ফুট (MAF) সোন নদীর জল এখন বিহার ও ঝাড়খণ্ডের মধ্যে ভাগ হবে।
নতুন সমঝোতা অনুযায়ী—
বিহার পাবে ৫.৭৫ MAF জল
ঝাড়খণ্ড পাবে ২ MAF জল
মোট বরাদ্দ: ৭.৭৫ MAF
১৯৭৩ সালের বাণসাগর চুক্তির সময় বিহার অবিভক্ত ছিল। ২০০০ সালে বিহার থেকে ঝাড়খণ্ড পৃথক রাজ্য হওয়ার পর প্রশ্ন ওঠে, আগের বরাদ্দকৃত সোন নদীর জল কীভাবে দুই রাজ্যের মধ্যে ভাগ করা হবে। সেই প্রশ্নের সমাধান নিয়েই দীর্ঘদিন ধরে মতপার্থক্য চলছিল।
কেন এতদিন ধরে চলছিল বিরোধ?
ঝাড়খণ্ড আলাদা রাজ্য হওয়ার পর অবিভক্ত বিহারের জন্য নির্ধারিত সোন নদীর জলের অংশ নতুন দুই রাজ্যের মধ্যে কীভাবে বণ্টন হবে, তা নিয়ে ঐকমত্য তৈরি হয়নি। এই অমীমাংসিত বিষয়টি শুধু জলবণ্টনেই আটকে থাকেনি, বরং সোন অববাহিকায় একাধিক জলসম্পদ প্রকল্পের ক্ষেত্রেও সমস্যা তৈরি করেছিল।
এর অন্যতম উদাহরণ ইন্দ্রপুরী রিজার্ভার প্রকল্প, যা আগে কাদওয়ান রিজার্ভার প্রকল্প নামে পরিচিত ছিল। কেন্দ্রীয় জল কমিশনের নথি অনুযায়ী, প্রকল্পটির অগ্রগতির ক্ষেত্রে সহ-অববাহিকা রাজ্যগুলির মধ্যে জলবণ্টন নিয়ে ঐকমত্যের প্রয়োজন ছিল। ঝাড়খণ্ডের পক্ষ থেকেও আগে সোন নদীর জলের বরাদ্দ নিয়ে বিরোধ মেটানোর বিষয়টি তুলে ধরা হয়েছিল।
কারা সবচেয়ে বেশি উপকৃত হবে?
চুক্তির ফলে বিহারের একাধিক জেলায় সেচ ও পানীয় জলের জোগান আরও পরিকল্পিতভাবে পরিচালনা করার সুযোগ তৈরি হবে। কেন্দ্রের দাবি অনুযায়ী, ভোজপুর, বক্সার, রোহতাস, কাইমুর, ঔরঙ্গাবাদ, অরবল, গয়া ও পাটনা-সহ বিহারের বিস্তীর্ণ অঞ্চলের কৃষক ও সাধারণ মানুষ এর সুবিধা পেতে পারেন।
অন্যদিকে ঝাড়খণ্ডের পালামু, গড়বা এবং অন্যান্য অঞ্চলেও সেচ ও পানীয় জলের ব্যবস্থাপনায় এই চুক্তির প্রভাব পড়তে পারে। ফলে দীর্ঘদিনের জলসংকট ও অনিশ্চয়তার পরিবর্তে নির্দিষ্ট বরাদ্দের ভিত্তিতে জলসম্পদ পরিকল্পনা করা সহজ হবে।
কৃষিক্ষেত্রে কী প্রভাব পড়তে পারে?
সোন নদীর জল বিহারের বিস্তীর্ণ কৃষি এলাকার জন্য গুরুত্বপূর্ণ। বরাদ্দের বিষয়ে দীর্ঘমেয়াদি সমাধান হলে সেচ ব্যবস্থার পরিকল্পনা আরও স্থিতিশীল হতে পারে। বিশেষ করে বৃষ্টিনির্ভর কৃষির উপর নির্ভরতা কমিয়ে সেচের জলের প্রাপ্যতা বাড়ানোর সুযোগ তৈরি হবে।
ঝাড়খণ্ডের ক্ষেত্রেও নির্দিষ্ট জলবরাদ্দ কৃষি ও গ্রামীণ জল ব্যবস্থাপনার ক্ষেত্রে নতুন পরিকল্পনার ভিত্তি তৈরি করতে পারে। কেন্দ্রের বক্তব্য অনুযায়ী, চুক্তির ফলে দুই রাজ্যের বিপুল সংখ্যক কৃষক উপকৃত হবেন।
শুধু জলবণ্টন নয়, আরও প্রকল্পের পথ খুলবে?
দীর্ঘদিনের জলবণ্টন বিরোধ মিটে যাওয়ায় সোন অববাহিকায় জলসম্পদ-নির্ভর প্রকল্পগুলির ক্ষেত্রেও সিদ্ধান্ত নেওয়া সহজ হতে পারে। বিশেষ করে ইন্দ্রপুরী রিজার্ভার প্রকল্পের মতো দীর্ঘদিন ধরে আলোচনায় থাকা প্রকল্পগুলির ক্ষেত্রে আন্তঃরাজ্য সমন্বয় গুরুত্বপূর্ণ।
তবে চুক্তি স্বাক্ষরিত হওয়াই শেষ ধাপ নয়। বাস্তবে বরাদ্দ অনুযায়ী জল সরবরাহ, পরিকাঠামো তৈরি, জল সংরক্ষণ এবং দুই রাজ্যের মধ্যে নিয়মিত সমন্বয়—এসবের উপরই চুক্তির সাফল্য নির্ভর করবে।
২৫ বছরের বিরোধ কীভাবে শেষ হল?
দুই রাজ্যের মধ্যে আলোচনার পাশাপাশি কেন্দ্রীয় স্তরে বিষয়টি নিয়ে দীর্ঘদিন ধরে আলোচনা চলছিল। কেন্দ্রীয় সরকারের বক্তব্য অনুযায়ী, আন্তঃরাজ্য বিরোধগুলি আলোচনার মাধ্যমে সমাধানের লক্ষ্যে Inter-State Council-এর মাধ্যমে একাধিক উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। সোন নদীর জলবণ্টন চুক্তিকেও সেই ধারার গুরুত্বপূর্ণ উদাহরণ হিসেবে তুলে ধরা হয়েছে।
অমিত শাহ এই চুক্তিকে ‘সহযোগিতামূলক যুক্তরাষ্ট্রীয় ব্যবস্থা’ বা cooperative federalism-এর উদাহরণ হিসেবে উল্লেখ করেছেন। তাঁর বক্তব্য, রাজ্যগুলির নিজস্ব স্বার্থ ও অগ্রাধিকার থাকলেও আলোচনার মাধ্যমে বৃহত্তর স্বার্থে সমাধানে পৌঁছনো সম্ভব।
কেন গুরুত্বপূর্ণ এই চুক্তি?
সোন নদীর জলবণ্টন নিয়ে ২৫ বছরের বিরোধের অবসান শুধু দুই রাজ্যের জলসম্পদ ব্যবস্থাপনাকেই প্রভাবিত করবে না, ভবিষ্যতে অন্যান্য আন্তঃরাজ্য নদীজল বিরোধ মেটানোর ক্ষেত্রেও এটি একটি নজির তৈরি করতে পারে।
ভারতে নদীর জল নিয়ে একাধিক রাজ্যের মধ্যে দীর্ঘদিন ধরে মতবিরোধ রয়েছে। সেই প্রেক্ষাপটে আদালত বা দীর্ঘ আইনি প্রক্রিয়ার পরিবর্তে পারস্পরিক আলোচনার মাধ্যমে সমঝোতায় পৌঁছনোর এই মডেল গুরুত্বপূর্ণ।
সোন নদীর জলবণ্টন চুক্তির মূল বার্তা তাই স্পষ্ট—২৫ বছরের অচলাবস্থা আলোচনার টেবিলেই শেষ করা সম্ভব। এখন নজর থাকবে, চুক্তির কাগজে থাকা বরাদ্দ বাস্তবে দুই রাজ্যের কৃষক ও সাধারণ মানুষের কাছে কতটা দ্রুত পৌঁছয়।
Keep reading
More in জাতীয়
জাতীয়
তামিলনাড়ুতে সেমিকন্ডাক্টর পার্ক, ফিনটেক ও লজিস্টিক্স হাব, ৫ হাজার কর্মসংস্থানের সম্ভাবনা
তামিলনাড়ুতে শিল্প ও প্রযুক্তি ক্ষেত্রে বড়সড় পরিকাঠামোগত উদ্যোগের ঘোষণা। কাঞ্চিপুরমে ১৭৫ কোটি টাকা ব্যয়ে সেমিকন্ডাক্টর ও ইলেকট্রনিক্স ম্য…
জাতীয়
অসমে দুধ উৎপাদন বাড়াতে বড় উদ্যোগ, ডেয়ারি খাত পর্যালোচনায় মুখ্যমন্ত্রী হিমন্ত বিশ্ব শর্মা
অসমের ডেয়ারি খাতকে আরও শক্তিশালী করতে পাঁচ বছরের রোডম্যাপ তৈরির নির্দেশ দিয়েছেন মুখ্যমন্ত্রী হিমন্ত বিশ্ব শর্মা। দুধ উৎপাদন বৃদ্ধি, ডেয়ারি স…
জাতীয়
দিল্লির ভোটার তালিকা নিয়ে কেজরিওয়ালের বিস্ফোরক দাবি, ‘১৪০ কোটি থেকে ৫০ কোটি হয়ে যাবে’
দিল্লির Special Intensive Revision বা SIR-এর পর প্রকাশিত খসড়া ভোটার তালিকায় প্রায় ৪৭.৭ লক্ষ ভোটারের নাম না থাকাকে কেন্দ্র করে রাজনৈতিক চাপা…
জাতীয়
নেশামুক্ত ভারত গড়ার অভিযানে যুবসমাজ, বড় বার্তা প্রধানমন্ত্রী মোদীর
নেশার বিরুদ্ধে দেশজুড়ে সচেতনতা তৈরির লক্ষ্যে ‘নেশামুক্ত যুব ফর বিকশিত ভারত’ অভিযান গতি পাচ্ছে বলে জানালেন প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী। তাঁর…
জাতীয়
India Debt: ২০৩০ সালের মধ্যে GDP-র ৫০% ঋণ কমানোর পথে ভারত, জানালেন নির্মলা সীতারমণ
ভারতের সরকারি ঋণ-জিডিপি অনুপাত ২০৩০ সালের মধ্যে প্রায় ৫০ শতাংশে নামিয়ে আনার লক্ষ্যে সরকার এগোচ্ছে বলে জানিয়েছেন কেন্দ্রীয় অর্থমন্ত্রী নির্মল…
জাতীয়
মোদীর তাসখন্দ সফর: লাল বাহাদুর শাস্ত্রীকে শ্রদ্ধা, উজবেক প্রেসিডেন্টের সঙ্গে বৃক্ষরোপণ
তাসখন্দে প্রাক্তন প্রধানমন্ত্রী লাল বাহাদুর শাস্ত্রীর স্মৃতির প্রতি শ্রদ্ধা জানালেন প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী। সফরকালে উজবেকিস্তানের প্রেস…
