ডিজিটাল গোপনীয়তা আইন নিয়ে আইনি লড়াই, চাপে সংবাদমাধ্যমের স্বাধীনতা
ডিজিটাল ব্যক্তিগত তথ্য সুরক্ষা আইনকে কেন্দ্র করে সংবাদমাধ্যমের স্বাধীনতা ও সাংবাদিকদের তথ্যসূত্রের গোপনীয়তা নিয়ে বিতর্ক তৈরি হয়েছে। ব্যক্তিগত তথ্যের অপব্যবহার রোধ করা যেমন জরুরি, তেমনই জনস্বার্থে সংবাদ প্রকাশ এবং অনুসন্ধানী সাংবাদিকতার স্বাধীনতা রক্ষা করাও গুরুত্বপূর্ণ। এই দুইয়ের মধ্যে ভারসাম্য কীভাবে বজায় থাকবে, তা নিয়েই শুরু হয়েছে আইনি ও নীতিগত আলোচনা।
লিখেছেন
Priya Jana
ডিজিটাল গোপনীয়তা আইন নিয়ে সুপ্রিম কোর্টে আইনি লড়াই, সংবাদমাধ্যমের স্বাধীনতা নিয়ে উদ্বেগ
নয়াদিল্লি: ডিজিটাল ব্যক্তিগত তথ্য সুরক্ষা আইনকে (Digital Personal Data Protection Act, 2023) কেন্দ্র করে সংবাদমাধ্যমের স্বাধীনতা, অনুসন্ধানী সাংবাদিকতা এবং সাংবাদিকদের তথ্যসূত্রের গোপনীয়তা নিয়ে নতুন করে বিতর্ক তৈরি হয়েছে। এই আইনের একাধিক বিধানকে চ্যালেঞ্জ জানিয়ে সুপ্রিম কোর্টের দ্বারস্থ হয়েছে ডিজিটাল নিউজ পাবলিশার্স অ্যাসোসিয়েশন (DNPA)। ২৭ অক্টোবর, ২০২৬-এ সুপ্রিম কোর্ট এই আবেদনের প্রেক্ষিতে কেন্দ্রীয় সরকারের জবাব চেয়েছে। মামলাটির পরবর্তী শুনানির দিন ধার্য হয়েছে ১৭ নভেম্বর।
কেন আইনি লড়াইয়ে সংবাদমাধ্যম?
ডিজিটাল যুগে ব্যক্তিগত তথ্যের সুরক্ষা নিশ্চিত করা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। কিন্তু সেই সুরক্ষা নিশ্চিত করতে গিয়ে সংবাদ সংগ্রহ ও প্রকাশের স্বাধীনতা বাধাগ্রস্ত হতে পারে কি না, তা নিয়েই মূল প্রশ্ন উঠেছে।
DNPA-র দাবি, ডিজিটাল ব্যক্তিগত তথ্য সুরক্ষা আইন এবং ২০২৫ সালের সংশ্লিষ্ট বিধিতে সাংবাদিকতার জন্য স্পষ্ট ছাড়ের ব্যবস্থা নেই। ফলে জনস্বার্থে কোনও ব্যক্তি, সংস্থা বা সরকারি কর্তৃপক্ষের বিরুদ্ধে অনিয়ম, দুর্নীতি কিংবা ক্ষমতার অপব্যবহার নিয়ে অনুসন্ধান চালানোর সময় সাংবাদিকদের সমস্যায় পড়তে হতে পারে।
সংগঠনটির আশঙ্কা, কোনও সংবাদ প্রকাশের আগে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তির সম্মতি নেওয়ার বাধ্যবাধকতা তৈরি হলে তদন্তের বিষয়বস্তু আগেভাগেই প্রকাশ্যে চলে আসতে পারে। এর ফলে প্রমাণ নষ্ট করা, সাক্ষীদের প্রভাবিত করা কিংবা অনুসন্ধান ব্যাহত করার সুযোগ তৈরি হতে পারে।
সাংবাদিকদের সূত্রের গোপনীয়তা নিয়ে উদ্বেগ
অনুসন্ধানী সাংবাদিকতার ক্ষেত্রে তথ্যদাতা বা গোপন সূত্রের ভূমিকা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। অনেক সময় সরকারি দফতর, কর্পোরেট সংস্থা কিংবা প্রশাসনের অভ্যন্তরীণ অনিয়ম সম্পর্কে তথ্য প্রকাশ্যে আনতে পরিচয় গোপন রাখতে চান তথ্যদাতারা।
DNPA-র বক্তব্য, আইনের নির্দিষ্ট বিধানের আওতায় সরকার তথ্য চাওয়ার ক্ষমতা পেলে এবং পর্যাপ্ত সুরক্ষা না থাকলে সাংবাদিকদের গোপনীয় সূত্রের পরিচয় প্রকাশ পাওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। এতে ভবিষ্যতে তথ্যদাতারা সাংবাদিকদের কাছে তথ্য দিতে দ্বিধা করতে পারেন।
সংবাদমাধ্যমের মতে, এই পরিস্থিতি অনুসন্ধানী সাংবাদিকতার পরিসর সংকুচিত করতে পারে। তবে এই আশঙ্কাগুলি আবেদনকারীদের বক্তব্য; মামলার চূড়ান্ত রায়ে আদালত কী অবস্থান নেয়, তা এখনও স্পষ্ট নয়।
ব্যক্তিগত তথ্য মুছে ফেলার অধিকার নিয়েও প্রশ্ন
ডিজিটাল ব্যক্তিগত তথ্য সুরক্ষা কাঠামোর অন্যতম উদ্দেশ্য হল ব্যক্তির তথ্যের ব্যবহার নিয়ন্ত্রণ করা এবং তার গোপনীয়তা রক্ষা করা। কিন্তু কোনও সংবাদে প্রকাশিত ব্যক্তিগত তথ্য মুছে ফেলা বা সংশোধনের দাবি উঠলে কী হবে, তা নিয়েও বিতর্ক রয়েছে।
DNPA-র আশঙ্কা, জনস্বার্থে প্রকাশিত কোনও তথ্যের বিষয়ে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তি আপত্তি জানালে বা তথ্য মুছে ফেলার দাবি করলে সংবাদমাধ্যমের উপর চাপ তৈরি হতে পারে। বিশেষত, দুর্নীতি বা জনজীবনের গুরুত্বপূর্ণ ঘটনা নিয়ে প্রকাশিত প্রতিবেদন সরিয়ে ফেলার দাবি উঠলে সংবাদমাধ্যমের স্বাধীনতা ও ঐতিহাসিক নথি সংরক্ষণের প্রশ্ন সামনে আসতে পারে।
তথ্যের অধিকার আইন সংশোধন নিয়েও বিতর্ক
এই আইনি লড়াইয়ের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হল তথ্যের অধিকার আইন বা RTI Act-এর সংশোধন। ডিজিটাল ব্যক্তিগত তথ্য সুরক্ষা আইনের ৪৪(৩) ধারার মাধ্যমে তথ্যের অধিকার আইনের ব্যক্তিগত তথ্য প্রকাশ-সংক্রান্ত বিধানে পরিবর্তন আনা হয়েছে।
আবেদনকারীদের বক্তব্য, সংশোধিত বিধান জনস্বার্থে ব্যক্তিগত তথ্য প্রকাশের ক্ষেত্রে আগের তুলনায় বেশি বাধা তৈরি করতে পারে। এর ফলে সরকারি কাজকর্মের স্বচ্ছতা, জবাবদিহি এবং নাগরিকদের তথ্য জানার অধিকারের উপর প্রভাব পড়ার আশঙ্কা রয়েছে।
সুপ্রিম কোর্টের অবস্থান কী?
২৭ অক্টোবরের শুনানিতে প্রধান বিচারপতি সূর্য কান্তের নেতৃত্বাধীন তিন বিচারপতির বেঞ্চ ব্যক্তিগত গোপনীয়তার অধিকার এবং সংবাদমাধ্যমের স্বাধীনতার মধ্যে ভারসাম্য বজায় রাখার প্রয়োজনীয়তার উপর জোর দেয়। বেঞ্চে বিচারপতি জয়মাল্য বাগচী এবং বিচারপতি ভি মোহনাও ছিলেন।
আদালত কেন্দ্রীয় সরকারের কাছে জবাব চেয়েছে এবং চ্যালেঞ্জ করা বিধানগুলির কার্যকারিতা স্থগিত রাখার আবেদনও বিবেচনার জন্য নোটিস জারি করেছে। তবে এই পর্যায়ে আদালত কোনও অন্তর্বর্তী স্থগিতাদেশ দেয়নি। পরবর্তী শুনানি ১৭ নভেম্বর ধার্য করা হয়েছে।
সামনে কী কী প্রশ্ন?
এই মামলার নিষ্পত্তি ভারতের ডিজিটাল সংবাদমাধ্যম, অনুসন্ধানী সাংবাদিকতা এবং তথ্যের অধিকার নিয়ে ভবিষ্যতের আলোচনায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা নিতে পারে। একদিকে নাগরিকদের ব্যক্তিগত তথ্যের অপব্যবহার রোধ করা জরুরি, অন্যদিকে জনস্বার্থে তথ্য প্রকাশের স্বাধীনতাও গণতন্ত্রের অন্যতম ভিত্তি।
আইনটির প্রয়োগে সাংবাদিকতার জন্য পৃথক সুরক্ষা থাকা উচিত কি না, গোপনীয় তথ্যদাতাদের পরিচয় কীভাবে রক্ষা করা হবে এবং ব্যক্তিগত গোপনীয়তা ও জনস্বার্থের মধ্যে ভারসাম্য কীভাবে নির্ধারিত হবে—এখন সেই প্রশ্নগুলির উত্তর খুঁজছে দেশের সর্বোচ্চ আদালত।
আইনি লড়াইয়ের পরবর্তী ধাপ: ১৭ নভেম্বরের শুনানিতে কেন্দ্রীয় সরকারের বক্তব্য এবং আদালতের পর্যবেক্ষণের দিকে নজর থাকবে সংবাদমাধ্যম ও আইন মহলের।
Keep reading
More in জাতীয়

জাতীয়
ইনস্টাগ্রামে ২১ লক্ষেরও বেশি ফলোয়ার, পঞ্চায়েত নির্বাচনে মাত্র ৩৩ ভোট পেলেন যোধপুরের জনপ্রিয় জ্যোতিষী
সোশ্যাল মিডিয়ায় ২১ লক্ষেরও বেশি মানুষের অনুসরণ থাকা সত্ত্বেও রাজস্থানের যোধপুরে সরপঞ্চ নির্বাচনে বড় ব্যবধানে পরাজিত হলেন জ্যোতিষী ও ইউটিউ…

জাতীয়
গুয়াহাটির হোটেলে গুলিকাণ্ডের আগে লিজ নিয়ে বৈঠক করেছিলেন অভিযুক্ত, প্রাথমিক তদন্তে সম্পত্তি বিবাদের ইঙ্গিত
অসমের গুয়াহাটির হোটেল বিলাস ইনে গুলিকাণ্ডে পাঁচজনের মৃত্যু এবং একজন আহত হওয়ার ঘটনায় বিশেষ তদন্তকারী দল (SIT) গঠন করেছে পুলিশ। প্রাথমিক তদ…

জাতীয়
গিগ কর্মী ও গৃহস্থালির কাজের হিসাব রাখতে শ্রম সমীক্ষায় বড় পরিবর্তনের পরিকল্পনা কেন্দ্রের
গিগ কর্মীদের কাজ এবং পরিবারের সদস্যদের অবৈতনিক গৃহস্থালির শ্রমের হিসাব আরও স্পষ্টভাবে তুলে ধরতে পিরিয়ডিক লেবার ফোর্স সার্ভে বা PLFS-এ পরিবর…

জাতীয়
তামিলনাড়ুর জেল ভেঙে পালানো ১৭ বন্দির মধ্যে ১৩ জন ধৃত, এখনও অধরা চার
তামিলনাড়ুর থেনি জেলার থেক্কামপট্টি জেল থেকে পালানো ১৭ জন বিচারাধীন বন্দির মধ্যে ১৩ জনকে ফের আটক করেছে পুলিশ। মঙ্গলবার সন্ধ্যা পর্যন্ত চলা অ…

জাতীয়
ট্রেন থেকে নিখোঁজ জন সুরাজ পার্টির সদস্য, রাঁচির কাছে রেললাইনের ধারে উদ্ধার দেহ
জন সুরাজ পার্টির ডিজিটাল কমিউনিকেশনস ম্যানেজার দেবপালিক গুপ্তের দেহ ঝাড়খণ্ডের রাঁচির কাছে রেললাইনের ধারের ঝোপ থেকে উদ্ধার হয়েছে। সোমবার রা…
জাতীয়
জম্মু-কাশ্মীরের ভারতের সঙ্গে সংযুক্তি ঐতিহাসিক, দেশের ঐক্য-অখণ্ডতা নিয়ে আপস নয়: বিজেপি সাংসদ শর্মা
জম্মু-কাশ্মীরের ভারতের সঙ্গে সংযুক্তিকে ঐতিহাসিক ঘটনা হিসেবে তুলে ধরলেন বিজেপি সাংসদ শর্মা। তাঁর বক্তব্য, দেশের ঐক্য ও অখণ্ডতা কোনওভাবেই আপস…
