মির্জা ফখরুল বাংলাদেশের রাষ্ট্রপতি: ভারতের জন্য সুখবর না উদ্বেগ, হাসিনার ভবিষ্যৎ কী?
বাংলাদেশের ২৩তম রাষ্ট্রপতি নির্বাচিত হয়েছেন বিএনপির প্রবীণ নেতা মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর। ২০ আগস্ট সংসদে ভোটাভুটিতে তিনি ২৫৫ ভোট পান, তাঁর প্রতিদ্বন্দ্বী কর্নেল (অব.) অলি আহমেদ পান ৮৮ ভোট। ১৯৯১ সালের পর এই প্রথম বাংলাদেশের রাষ্ট্রপতি নির্বাচন প্রতিদ্বন্দ্বিতাপূর্ণ হল। তাঁর রাষ্ট্রপতি হওয়া মূলত সাংবিধানিক ও প্রতীকী পদে পরিবর্তন হলেও ভারত-বাংলাদেশ সম্পর্ক, শেখ হাসিনার প্রত্যর্পণ এবং ঢাকার রাজনৈতিক অবস্থানের ক্ষেত্রে এর তাৎপর্য রয়েছে।
লিখেছেন
Priya Jana
মির্জা ফখরুলই বাংলাদেশের নতুন রাষ্ট্রপতি, ভারতের জন্য কতটা গুরুত্বপূর্ণ এই বদল?
বাংলাদেশের রাজনীতিতে বড় পরিবর্তন। বিএনপির প্রবীণ নেতা মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর দেশের ২৩তম রাষ্ট্রপতি নির্বাচিত হয়েছেন। বৃহস্পতিবার, ২০ আগস্ট জাতীয় সংসদে অনুষ্ঠিত ভোটাভুটিতে তিনি ২৫৫ ভোট পেয়ে জয়ী হন। তাঁর একমাত্র প্রতিদ্বন্দ্বী লিবারেল ডেমোক্রেটিক পার্টির নেতা কর্নেল (অব.) অলি আহমেদ পান ৮৮ ভোট। ১৯৯১ সালের পর এই প্রথম বাংলাদেশে রাষ্ট্রপতি নির্বাচন প্রতিদ্বন্দ্বিতার মুখ দেখল।
মির্জা ফখরুল এর আগে দীর্ঘদিন বিএনপির মহাসচিব ছিলেন। রাষ্ট্রপতি পদে প্রার্থী হওয়ার পর তিনি দলীয় মহাসচিবের পদ থেকে সরে দাঁড়ান। শুক্রবার বঙ্গভবনে তাঁর শপথ নেওয়ার কথা।
কেন মির্জা ফখরুলের রাষ্ট্রপতি হওয়া তাৎপর্যপূর্ণ?
বাংলাদেশের সংবিধান অনুযায়ী রাষ্ট্রপতি রাষ্ট্রের সাংবিধানিক প্রধান হলেও দৈনন্দিন প্রশাসনিক ক্ষমতার মূল কেন্দ্র প্রধানমন্ত্রী। ফলে মির্জা ফখরুল রাষ্ট্রপতি হওয়াকে সরাসরি বাংলাদেশের নীতি পরিবর্তনের সমার্থক হিসেবে দেখা ঠিক হবে না।
তবে সাম্প্রতিক রাজনৈতিক পরিবর্তনের প্রেক্ষাপট আলাদা। বিএনপি ২০২৬ সালের নির্বাচনের পর ক্ষমতায় ফিরেছে এবং তারেক রহমান প্রধানমন্ত্রী হিসেবে সরকার পরিচালনা করছেন। সেই সরকারের সঙ্গে রাষ্ট্রপতি ভবনের সমন্বয় রাজনৈতিক স্থিতিশীলতার ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ হতে পারে।
আরও একটি বিষয় গুরুত্বপূর্ণ—রাষ্ট্রপতি বাংলাদেশের সশস্ত্র বাহিনীর সর্বাধিনায়ক। রাজনৈতিক অস্থিরতার সময়ে এই সাংবিধানিক ভূমিকার গুরুত্ব বেড়ে যায়।
ভারতের জন্য সুখবর, না কি নতুন কূটনৈতিক চ্যালেঞ্জ?
নয়া দিল্লির জন্য মির্জা ফখরুলের রাষ্ট্রপতি হওয়াকে সরাসরি ‘ভালো’ বা ‘খারাপ’ বলে চিহ্নিত করা কঠিন। কারণ ভারতের সঙ্গে বাংলাদেশের সম্পর্ক নির্ধারণে রাষ্ট্রপতির চেয়ে প্রধানমন্ত্রী ও সরকারের পররাষ্ট্রনীতি অনেক বেশি গুরুত্বপূর্ণ।
তবে রাজনৈতিকভাবে এটি ভারতের জন্য একটি নতুন বাস্তবতা। শেখ হাসিনা সরকারের সঙ্গে দীর্ঘদিনের কাজের সম্পর্কের পর এখন ঢাকায় বিএনপি নেতৃত্বাধীন সরকার। ফলে দিল্লিকে নতুন রাজনৈতিক নেতৃত্বের সঙ্গে সম্পর্ক পুনর্গঠনের পথে এগোতে হবে।
বিশেষ করে সীমান্ত নিরাপত্তা, বাণিজ্য, নদীর জলবণ্টন, যোগাযোগ, উত্তর-পূর্ব ভারতের সঙ্গে সংযোগ এবং আঞ্চলিক নিরাপত্তার মতো বিষয়গুলিতে দুই দেশের সম্পর্কের ধারাবাহিকতা বজায় রাখা ভারতের অন্যতম প্রধান স্বার্থ।
ইতিমধ্যেই বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের ২৩ থেকে ২৫ আগস্ট ভারত সফরের সম্ভাবনা নিয়ে আলোচনা শুরু হয়েছে। সফরটি হলে সেটি নতুন বিএনপি সরকারের সঙ্গে দিল্লির সম্পর্কের দিকনির্দেশ বোঝার ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ হতে পারে।
শেখ হাসিনার জন্য কী অর্থ বহন করে মির্জা ফখরুলের রাষ্ট্রপতি হওয়া?
এই প্রশ্নটিই সম্ভবত সবচেয়ে বেশি আলোচনায় থাকবে। শেখ হাসিনা ২০২৪ সালে বাংলাদেশ ছাড়ার পর ভারতে অবস্থান করছেন। বাংলাদেশের বর্তমান সরকারের সঙ্গে তাঁর রাজনৈতিক দূরত্ব স্পষ্ট।
ঢাকা ইতিমধ্যেই শেখ হাসিনাকে বাংলাদেশে ফেরত পাঠানোর দাবি জানিয়েছে। ফলে মির্জা ফখরুল রাষ্ট্রপতি হওয়া এমন একটি রাজনৈতিক ব্যবস্থাকে আরও সুসংহত করছে, যেখানে বিএনপি এখন রাষ্ট্রের প্রধান রাজনৈতিক শক্তিগুলির একটি।
তবে রাষ্ট্রপতি হিসেবে মির্জা ফখরুল ব্যক্তিগতভাবে শেখ হাসিনার প্রত্যর্পণ প্রশ্নে কী অবস্থান নেবেন, তা নিয়ে নিশ্চিত সিদ্ধান্তে পৌঁছনোর মতো তথ্য এখনও নেই। প্রত্যর্পণ ও বিচারসংক্রান্ত বিষয় অনেক বেশি সরকারের কূটনৈতিক ও আইনি সিদ্ধান্তের ওপর নির্ভর করবে।
শেখ হাসিনা অবশ্য ডিসেম্বর মাসে বাংলাদেশে ফেরার ইচ্ছা প্রকাশ করেছেন বলে সাম্প্রতিক প্রতিবেদনে উঠে এসেছে। ফলে আগামী কয়েক মাসে তাঁর প্রত্যাবর্তন, আওয়ামী লীগের ভবিষ্যৎ এবং বিএনপি সরকারের অবস্থান—সবই দক্ষিণ এশিয়ার রাজনীতিতে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠতে পারে।
রাষ্ট্রপতি পদে মির্জা ফখরুল কি বিএনপির ক্ষমতা আরও শক্ত করবে?
রাজনৈতিক প্রতীকের দিক থেকে অবশ্যই। দীর্ঘ সময় বিরোধী রাজনীতিতে থাকা বিএনপি এখন প্রধানমন্ত্রী ও রাষ্ট্রপতি—দুই শীর্ষ সাংবিধানিক পদেই নিজেদের রাজনৈতিক উপস্থিতি প্রতিষ্ঠা করেছে।
তবে এটাও মনে রাখতে হবে, রাষ্ট্রপতির ক্ষমতা বাংলাদেশের রাজনৈতিক ব্যবস্থায় সীমিত। ফলে মির্জা ফখরুলের নির্বাচনকে বিএনপির প্রশাসনিক ক্ষমতা দ্বিগুণ হয়ে যাওয়া হিসেবে দেখা উচিত নয়।
বরং তাঁর সবচেয়ে বড় ভূমিকা হতে পারে রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানগুলির মধ্যে সমন্বয় এবং রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা বজায় রাখা। সাম্প্রতিক অস্থিরতার পর বাংলাদেশে এই দায়িত্ব যথেষ্ট গুরুত্বপূর্ণ।
ভারত-বাংলাদেশ সম্পর্কের সামনে এখন কী?
ভারতের জন্য সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হবে ব্যক্তির চেয়ে রাষ্ট্রীয় স্বার্থকে অগ্রাধিকার দেওয়া। বিএনপি সরকারের সঙ্গে নতুন করে আস্থা তৈরি, সীমান্তে সহযোগিতা, বাণিজ্য ও যোগাযোগের ধারাবাহিকতা এবং নিরাপত্তা সহযোগিতা—এসব ক্ষেত্রেই নজর থাকবে।
অন্যদিকে বাংলাদেশের দিক থেকেও ভারতের সঙ্গে সম্পর্ক পুরোপুরি এড়িয়ে যাওয়ার সুযোগ নেই। ভৌগোলিক অবস্থান, অর্থনীতি ও আঞ্চলিক নিরাপত্তার কারণে দুই দেশের সম্পর্ক পারস্পরিক নির্ভরশীল।
তাই মির্জা ফখরুলের রাষ্ট্রপতি হওয়া ভারতের জন্য তাৎক্ষণিক ‘খারাপ খবর’ নয়। বরং এটি একটি নতুন রাজনৈতিক সমীকরণ, যেখানে দিল্লিকে শেখ হাসিনা-পরবর্তী বাংলাদেশের সঙ্গে নতুন বাস্তবতায় কূটনৈতিক সম্পর্ক পরিচালনা করতে হবে।
শেষ কথা
মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরের রাষ্ট্রপতি নির্বাচন বাংলাদেশের রাজনৈতিক পালাবদরের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়। ২৫৫ ভোটে জয় এবং ৩৫ বছর পর প্রতিদ্বন্দ্বিতাপূর্ণ রাষ্ট্রপতি নির্বাচন—দুটি ঘটনাই এই পরিবর্তনের রাজনৈতিক গুরুত্ব তুলে ধরছে।
ভারতের জন্য এর তাৎপর্য মূলত নির্ভর করবে বিএনপি নেতৃত্বাধীন সরকারের পররাষ্ট্রনীতি এবং দিল্লি-ঢাকা সম্পর্ক কোন পথে এগোয় তার ওপর। আর শেখ হাসিনার ক্ষেত্রে সবচেয়ে বড় প্রশ্ন থেকে যাচ্ছে—বাংলাদেশে তাঁর রাজনৈতিক ভবিষ্যৎ কী এবং প্রত্যর্পণ ইস্যুতে ঢাকা-দিল্লির সম্পর্ক কোন দিকে যায়।
অর্থাৎ, মির্জা ফখরুলের রাষ্ট্রপতি হওয়া নিজে কোনও চূড়ান্ত উত্তর নয়; বরং এটি বাংলাদেশ-ভারত সম্পর্ক এবং শেখ হাসিনার ভবিষ্যৎ ঘিরে নতুন এক রাজনৈতিক অধ্যায়ের সূচনা।
Keep reading
More in আন্তর্জাতিক
আন্তর্জাতিক
চীনা পণ্যে ৭.৫% শুল্ক বসাতে পারে আমেরিকা, ট্রাম্প-শি বৈঠকের আগে বড় ধাক্কার আশঙ্কা
ট্রাম্প-শি জিনপিং বৈঠকের আগে চীনা পণ্যের উপর অতিরিক্ত ৭.৫ শতাংশ শুল্ক আরোপের কথা বিবেচনা করছে মার্কিন প্রশাসন। অতিরিক্ত উৎপাদন ক্ষমতা ও কম দ…
আন্তর্জাতিক
হিলারি ক্লিনটনের বড় মন্তব্য: মার্কিন-ইরান যুদ্ধ থামাতে ভারত ও চীনই কি চাবিকাঠি?
মার্কিন-ইরান সংঘাতের অবসানের ক্ষেত্রে ভারত ও চীন গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা নিতে পারে বলে মন্তব্য করেছেন প্রাক্তন মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী হিলারি ক…
আন্তর্জাতিক
India-ইউরোপ সম্পর্ক: নতুন বিশ্বব্যবস্থায় সমান অংশীদারিত্বের সময়
বিশ্ব রাজনীতিতে দ্রুত বদল আসছে। রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধ, যুক্তরাষ্ট্র-চিন প্রতিদ্বন্দ্বিতা, সরবরাহ শৃঙ্খলের অনিশ্চয়তা এবং নতুন ভূরাজনৈতিক সমীকর…
আন্তর্জাতিক
Northern Sea Route Explained: আর্কটিকের বরফ গললে বিশ্ব বাণিজ্যে কী বদল, ভারতের লাভ কোথায়?
আর্কটিক অঞ্চলের বরফ গলার সঙ্গে সঙ্গে নর্দার্ন সি রুট বা Northern Sea Route নিয়ে বিশ্বজুড়ে আগ্রহ বাড়ছে। রাশিয়ার উত্তর উপকূল ঘেঁষে চলা এই সম…
আন্তর্জাতিক
সৌদিতে হুথি হামলা, ইজরায়েলের নিশানায় তুরস্ক: মক্কা চুক্তি কোথায়?
৭ আগস্ট ২০২৬ সৌদি আরব, তুরস্ক ও পাকিস্তান মক্কায় যৌথ প্রতিরক্ষা চুক্তি স্বাক্ষর করে। চুক্তিতে বলা হয়েছে, তিন দেশের কোনও একটির উপর সশস্ত্র হা…
আন্তর্জাতিক
জয়শঙ্কর রাশিয়ায়, ডোভাল চিনে: ভারত কী পরিকল্পনা করছে? ব্যাখ্যা
একদিকে রাশিয়ায় বিদেশমন্ত্রী এস জয়শঙ্কর, অন্যদিকে চিনে জাতীয় নিরাপত্তা উপদেষ্টা অজিত ডোভাল। একই সময়ে দুই গুরুত্বপূর্ণ কূটনৈতিক তৎপরতা ঘিরে প্…
