আন্তর্জাতিক

রাশিয়া-ভারত রেলপথ: পাকিস্তান হয়ে নতুন বাণিজ্য রুটের পরিকল্পনা, হরমুজ সংকটে পুতিনের বড় পদক্ষেপ?

হরমুজ প্রণালী ও বসফরাসে ভূ-রাজনৈতিক অস্থিরতার মধ্যে ভারত-রাশিয়া বাণিজ্যের জন্য বিকল্প স্থলপথ তৈরির পরিকল্পনা করছে মস্কো। রাশিয়ার উপ-প্রধানমন্ত্রী মারাত খুসনুলিন জানিয়েছেন, ভারতীয় মহাসাগর পর্যন্ত রেল সংযোগের সম্ভাবনা খতিয়ে দেখা হচ্ছে। সম্ভাব্য রুটটি তুর্কমেনিস্তান, ইরান, আফগানিস্তান ও পাকিস্তানের মধ্য দিয়ে যেতে পারে। তবে এটি এখনও প্রস্তাবের পর্যায়ে রয়েছে এবং বাস্তবায়নের পথে একাধিক কূটনৈতিক ও নিরাপত্তাগত চ্যালেঞ্জ রয়েছে।

Share
রাশিয়া-ভারত রেলপথ: পাকিস্তান হয়ে নতুন বাণিজ্য রুটের পরিকল্পনা, হরমুজ সংকটে পুতিনের বড় পদক্ষেপ?

হরমুজের বিকল্প পথ খুঁজছে রাশিয়া, ভারত পর্যন্ত রেলপথের প্রস্তাব

হরমুজ প্রণালীকে ঘিরে চলা ভূ-রাজনৈতিক সংকট আন্তর্জাতিক বাণিজ্য ব্যবস্থায় নতুন করে উদ্বেগ তৈরি করেছে। এই পরিস্থিতিতে ভারত ও রাশিয়ার মধ্যে বাণিজ্যিক যোগাযোগ আরও শক্তিশালী করতে সমুদ্রপথের বিকল্প হিসেবে রেলপথ তৈরির সম্ভাবনা খতিয়ে দেখছে মস্কো। রাশিয়ার উপ-প্রধানমন্ত্রী মারাত খুসনুলিন ভারতীয় মহাসাগর পর্যন্ত একটি রেল সংযোগের সম্ভাবনা বিবেচনা করার কথা জানিয়েছেন।

প্রস্তাবিত রুটের সবচেয়ে চমকপ্রদ দিক হল, এটি তুর্কমেনিস্তান, ইরান, আফগানিস্তান এবং পাকিস্তানের মধ্য দিয়ে ভারতের দিকে পৌঁছতে পারে। খুসনুলিনের বক্তব্য অনুযায়ী, ভারত পর্যন্ত যোগাযোগের সুযোগ তৈরি করে এমন যে কোনও বিকল্প রুট বিবেচনা করতে প্রস্তুত রাশিয়া।

কেন হঠাৎ রেলপথের কথা ভাবছে মস্কো?

রাশিয়ার এই উদ্যোগের নেপথ্যে রয়েছে আন্তর্জাতিক বাণিজ্যপথের নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বেগ। বসফরাস ও হরমুজ—দুই গুরুত্বপূর্ণ জলপথই সাম্প্রতিক বছরগুলিতে ভূ-রাজনৈতিক সংঘাতের প্রভাবের মুখে পড়েছে। ফলে সমুদ্রপথের উপর অতিরিক্ত নির্ভরতা কমিয়ে বিকল্প স্থলপথ তৈরি করা মস্কোর কাছে কৌশলগতভাবে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে।

বিশেষ করে হরমুজ প্রণালী বিশ্ব জ্বালানি বাণিজ্যের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ পথ। এই জলপথে কোনও বড় ধরনের বাধা তৈরি হলে তেল, গ্যাস এবং অন্যান্য পণ্যের পরিবহণে প্রভাব পড়তে পারে। এমন পরিস্থিতিতে স্থলপথে পণ্য পরিবহণের সুযোগ ভারত ও রাশিয়া—দুই দেশের কাছেই গুরুত্বপূর্ণ বিকল্প হয়ে উঠতে পারে।

পাকিস্তান হয়ে ভারত! বাস্তবে কতটা সম্ভব?

প্রস্তাবিত রুটের মধ্যে পাকিস্তানের নামই সবচেয়ে বেশি নজর কেড়েছে। কারণ ভারত-পাকিস্তানের মধ্যে দীর্ঘদিন ধরে রাজনৈতিক ও কূটনৈতিক উত্তেজনা রয়েছে। দুই দেশের স্থলবাণিজ্যও নানা সময়ে বাধার মুখে পড়েছে।

তাই রাশিয়ার প্রস্তাবিত রেল করিডর বাস্তবায়ন করতে হলে শুধু অবকাঠামো তৈরি করলেই হবে না; ভারত, পাকিস্তান, আফগানিস্তান, ইরান ও মধ্য এশিয়ার দেশগুলির মধ্যে দীর্ঘমেয়াদি রাজনৈতিক সমঝোতাও প্রয়োজন হবে।

অর্থাৎ, রেললাইন তৈরির প্রযুক্তিগত সম্ভাবনার পাশাপাশি এই প্রকল্পের সবচেয়ে বড় প্রশ্ন হতে পারে কূটনৈতিক সম্পর্ক এবং নিরাপত্তা।

INSTC-এর সঙ্গে কী সম্পর্ক?

ভারত-রাশিয়া বাণিজ্য যোগাযোগের ক্ষেত্রে ইতিমধ্যেই গুরুত্বপূর্ণ একটি প্রকল্প রয়েছে—ইন্টারন্যাশনাল নর্থ-সাউথ ট্রান্সপোর্ট করিডর বা INSTC। এই করিডর ভারতকে ইরানের মাধ্যমে রাশিয়া ও ইউরেশিয়ার সঙ্গে যুক্ত করার লক্ষ্য নিয়ে তৈরি হয়েছে। প্রস্তাবিত নতুন রেল সংযোগকে সেই বৃহত্তর আঞ্চলিক যোগাযোগ ব্যবস্থার পরিপূরক হিসেবেও দেখা যেতে পারে।

INSTC-র পাশাপাশি ভারতের চাবাহার বন্দরও মধ্য এশিয়া ও আফগানিস্তানের সঙ্গে যোগাযোগের ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ। ভারত ভবিষ্যতে INSTC ও চাবাহারকে আরও কার্যকরভাবে যুক্ত করার পরিকল্পনা করছে।

রাশিয়ার জন্য ভারতের গুরুত্ব কেন বাড়ছে?

ইউক্রেন যুদ্ধ ও পশ্চিমা নিষেধাজ্ঞার পর রাশিয়া আন্তর্জাতিক বাণিজ্যের জন্য বিকল্প বাজার ও পরিবহণপথের উপর গুরুত্ব বাড়িয়েছে। অন্যদিকে পশ্চিম এশিয়ার অস্থিরতার কারণে ভারতও নিজের জ্বালানি সরবরাহ ব্যবস্থা আরও বৈচিত্র্যময় করার চেষ্টা করছে।

রাশিয়া ইতিমধ্যেই ভারতের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ জ্বালানি সরবরাহকারী। সাম্প্রতিক সময়ে ভারতীয় বাজারে রুশ অপরিশোধিত তেলের গুরুত্বও বেড়েছে। একই সঙ্গে কয়লা, সার এবং অন্যান্য পণ্যের ক্ষেত্রেও দুই দেশের বাণিজ্যিক সম্পর্ক সম্প্রসারিত হয়েছে।

ফলে ভারত-রাশিয়া বাণিজ্যের জন্য নিরাপদ, নির্ভরযোগ্য এবং তুলনামূলকভাবে কম ঝুঁকিপূর্ণ পরিবহণ ব্যবস্থা তৈরি করা মস্কোর কাছে কৌশলগত গুরুত্ব পাচ্ছে।

পুতিনের বড় পরিকল্পনা?

এই প্রস্তাবকে সরাসরি রুশ প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিনের ঘোষিত নতুন প্রকল্প বলা ঠিক হবে না। সাম্প্রতিক রিপোর্ট অনুযায়ী, রেল সংযোগের সম্ভাবনা সামনে এনেছেন রাশিয়ার উপ-প্রধানমন্ত্রী মারাত খুসনুলিন। তাই বিষয়টি আপাতত রাশিয়া সরকারের একটি কৌশলগত প্রস্তাব ও সম্ভাব্যতা যাচাইয়ের পর্যায়ে রয়েছে।

তবে ভারত-রাশিয়া সম্পর্কের বৃহত্তর প্রেক্ষাপটে এই উদ্যোগ যথেষ্ট তাৎপর্যপূর্ণ। কারণ সফল হলে সমুদ্রপথের পাশাপাশি ইউরেশিয়ার মধ্য দিয়ে স্থলপথে পণ্য পরিবহণের নতুন সুযোগ তৈরি হতে পারে।

ভারত-রাশিয়া বাণিজ্যে কী বদল আনতে পারে?

এই ধরনের রেল করিডর বাস্তবায়িত হলে ভারত ও রাশিয়ার মধ্যে পণ্য পরিবহণের জন্য নতুন একটি বিকল্প তৈরি হবে। সমুদ্রপথে ভূ-রাজনৈতিক ঝুঁকি বাড়লে স্থলপথ ব্যবহার করা সম্ভব হতে পারে।

তবে প্রকল্পটি বাস্তবায়নের আগে কয়েকটি বড় প্রশ্নের উত্তর প্রয়োজন—কোন দেশগুলি অর্থায়ন করবে, কোন রুটে রেললাইন তৈরি হবে, সীমান্ত পারাপারের ব্যবস্থা কী হবে, নিরাপত্তা কীভাবে নিশ্চিত করা হবে এবং ভারত-পাকিস্তানের মধ্যে বাণিজ্যিক যোগাযোগ কতটা স্বাভাবিক করা সম্ভব হবে।

এই কারণেই আপাতত এটিকে সম্ভাব্য রুট হিসেবে দেখা হচ্ছে, বাস্তবায়নাধীন রেলপথ হিসেবে নয়।

হরমুজ সংকটে কেন এই উদ্যোগ গুরুত্বপূর্ণ?

হরমুজ প্রণালীতে দীর্ঘস্থায়ী অস্থিরতা আন্তর্জাতিক সরবরাহ ব্যবস্থাকে বড় ধরনের ঝুঁকির মধ্যে ফেলতে পারে। ভারতের মতো জ্বালানি আমদানিনির্ভর অর্থনীতির জন্য বিকল্প সরবরাহপথ তাই কৌশলগতভাবে গুরুত্বপূর্ণ। ২০২৬ সালের হরমুজ সংকট ইতিমধ্যেই জ্বালানি পরিবহণ ও বাণিজ্যপথের ঝুঁকিকে সামনে এনেছে।

এই পরিস্থিতিতে রাশিয়ার প্রস্তাবিত রেল সংযোগ শুধু ভারত-রাশিয়া বাণিজ্যের বিষয় নয়। এটি বৃহত্তর ইউরেশীয় বাণিজ্য ব্যবস্থায় সমুদ্রপথের উপর নির্ভরতা কমানোর একটি সম্ভাব্য কৌশল।

সবচেয়ে বড় বাধা অবশ্যই ভূ-রাজনীতি। পাকিস্তান ও আফগানিস্তানের নিরাপত্তা পরিস্থিতি, ভারত-পাকিস্তান সম্পর্ক এবং ইরানের সঙ্গে আঞ্চলিক যোগাযোগ—সবকিছুর উপরই প্রকল্পটির ভবিষ্যৎ নির্ভর করবে।

তবু মস্কোর এই প্রস্তাব একটি বিষয় স্পষ্ট করে দিয়েছে—বিশ্ব বাণিজ্যের গুরুত্বপূর্ণ জলপথগুলি যখন একের পর এক ভূ-রাজনৈতিক ঝুঁকির মুখে পড়ছে, তখন ভারত ও রাশিয়া বিকল্প স্থল সংযোগকে ভবিষ্যতের কৌশলগত হাতিয়ার হিসেবে দেখছে।

Enjoyed this story? Share it.

Share