রাজনীতি

তৃণমূলের নাম-প্রতীক বিতর্কে প্যারাগ্রাফ ১৫-তেই নজর কমিশনের, কী এই বিশেষ আইনি ক্ষমতা?

তৃণমূল কংগ্রেসের নাম ও ‘ফুল-ঘাস’ প্রতীক নিয়ে দুই গোষ্ঠীর দাবির জেরে নির্বাচন কমিশনের নজরে এসেছে Election Symbols (Reservation & Allotment) Order, 1968-এর Paragraph 15। এই ধারার আওতায় কোনও স্বীকৃত রাজনৈতিক দলের দুই প্রতিদ্বন্দ্বী গোষ্ঠী একই দল ও প্রতীকের দাবি করলে কমিশন শুনানি করে ঠিক করতে পারে, কোন গোষ্ঠীকে দল হিসেবে স্বীকৃতি দেওয়া হবে। তবে তৃণমূলের বর্তমান ঘটনায় কমিশন এখনও চূড়ান্তভাবে কোনও গোষ্ঠীকে মূল দলের উত্তরাধিকারী ঘোষণা করেনি। আসন্ন উপনির্বাচনের কথা মাথায় রেখে আপাতত মূল নাম ও প্রতীক ব্যবহারে অন্তর্বর্তী নিষেধাজ্ঞা জারি করে দুই পক্ষকে পৃথক নাম ও প্রতীক দেওয়া হয়েছে।

Share
তৃণমূলের নাম-প্রতীক বিতর্কে প্যারাগ্রাফ ১৫-তেই নজর কমিশনের, কী এই বিশেষ আইনি ক্ষমতা?

তৃণমূলের নাম-প্রতীক বিতর্কে কেন গুরুত্বপূর্ণ Paragraph 15?

তৃণমূল কংগ্রেসের সাংগঠনিক নিয়ন্ত্রণ, দলের নাম এবং নির্বাচনী প্রতীক নিয়ে তৈরি হওয়া বিরোধ এখন পৌঁছেছে নির্বাচন কমিশনের আইনি সিদ্ধান্তের গুরুত্বপূর্ণ একটি পর্যায়ে। কমিশনের সাম্প্রতিক অন্তর্বর্তী নির্দেশে স্পষ্ট হয়েছে, বিষয়টি শেষ পর্যন্ত Election Symbols (Reservation & Allotment) Order, 1968-এর Paragraph 15-এর আওতায় চূড়ান্তভাবে নির্ধারণ করতে হবে।

কিন্তু কী এই Paragraph 15? কেন রাজনৈতিক দলের ভাঙন বা দুই গোষ্ঠীর মধ্যে নাম-প্রতীক নিয়ে বিরোধ তৈরি হলে এই ধারার গুরুত্ব বেড়ে যায়?

Paragraph 15 আসলে কী?

সহজ ভাষায়, Paragraph 15 হল স্বীকৃত রাজনৈতিক দলের দুই বা তার বেশি গোষ্ঠীর মধ্যে দল ও নির্বাচনী প্রতীকের দাবিদাওয়া মেটানোর জন্য নির্বাচন কমিশনের ব্যবহৃত আইনি ব্যবস্থা।

এই ধারায় বলা হয়েছে, কোনও স্বীকৃত রাজনৈতিক দলের প্রতিদ্বন্দ্বী অংশ বা গোষ্ঠী নিজেদের ওই দলের পরিচয় দাবি করলে এবং কমিশন সেই পরিস্থিতি সম্পর্কে সন্তুষ্ট হলে, দুই পক্ষের বক্তব্য শুনে এবং সংশ্লিষ্ট তথ্য-প্রমাণ বিবেচনা করে সিদ্ধান্ত নিতে পারে—কোন গোষ্ঠীকে স্বীকৃত রাজনৈতিক দল হিসেবে গণ্য করা হবে। এমনকি প্রয়োজন হলে কোনও গোষ্ঠীকেই মূল দল হিসেবে স্বীকৃতি না দেওয়ার সিদ্ধান্তও নেওয়া যেতে পারে। কমিশনের এই সিদ্ধান্ত সংশ্লিষ্ট প্রতিদ্বন্দ্বী গোষ্ঠীগুলির ক্ষেত্রে বাধ্যতামূলক।

তৃণমূলের ক্ষেত্রে কমিশন কী বলেছে?

১৭ সেপ্টেম্বর ২০২৬-এর অন্তর্বর্তী নির্দেশে কমিশন জানায়, All India Trinamool Congress-এর মধ্যে দুটি প্রতিদ্বন্দ্বী গোষ্ঠী রয়েছে এবং দুই পক্ষই নিজেদের দল হিসেবে দাবি করছে। এই পরিস্থিতিতে বিষয়টির চূড়ান্ত নিষ্পত্তির জন্য Paragraph 15-এর অধীনে substantive determination প্রয়োজন বলে কমিশন উল্লেখ করে।

তবে উপনির্বাচনের সময়সীমা সামনে থাকায় সেই পূর্ণাঙ্গ প্রক্রিয়া শেষ করার মতো সময় কমিশনের হাতে ছিল না। তাই আপাতত দুই পক্ষকে সমান অবস্থানে রাখার জন্য মূল দলীয় নাম ও সংরক্ষিত প্রতীক ব্যবহারে অন্তর্বর্তী ব্যবস্থা নেওয়া হয়।

‘ফুল-ঘাস’ প্রতীক কেন আপাতত ব্যবহার করা যাচ্ছে না?

কমিশনের অন্তর্বর্তী নির্দেশ অনুযায়ী, দুই পক্ষই আপাতত ‘All India Trinamool Congress’ নাম এবং ‘Flowers and Grass’ প্রতীক ব্যবহার করতে পারবে না। পরিবর্তে দুই পক্ষকে নিজেদের জন্য পৃথক নাম এবং কমিশনের নির্ধারিত মুক্ত প্রতীক থেকে আলাদা প্রতীক বেছে নেওয়ার সুযোগ দেওয়া হয়।

১৮ সেপ্টেম্বর কমিশন পরবর্তী নির্দেশে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের নেতৃত্বাধীন গোষ্ঠীকে ‘Mamata All India Trinamool Congress’ নাম ও ‘Football Player’ প্রতীক এবং অরূপ রায়ের নেতৃত্বাধীন গোষ্ঠীকে ‘Democratic Trinamool Congress’ নাম ও ‘Envelope’ প্রতীক দেয়। এই ব্যবস্থা সংশ্লিষ্ট উপনির্বাচনের জন্য কার্যকর।

Paragraph 15-এ শুধু সাংসদ-বিধায়ক সংখ্যাই কি দেখা হয়?

এখানেই বিষয়টি গুরুত্বপূর্ণ। Paragraph 15-এর অধীনে দলীয় বিরোধের নিষ্পত্তিতে কমিশনের বিবেচনার বিষয় শুধু বিধায়ক বা সাংসদের সংখ্যা নয়। নির্বাচন কমিশনের আগের সিদ্ধান্ত ও সুপ্রিম কোর্টের Sadiq Ali মামলায় প্রতিষ্ঠিত নীতির ভিত্তিতে দলীয় সংবিধান, সংগঠনের কাঠামো এবং নির্বাচিত প্রতিনিধিদের সংখ্যাগত শক্তি-সহ বিভিন্ন বিষয় বিবেচনা করা হতে পারে।

সাধারণভাবে এই পরীক্ষায় প্রথমে দেখা হতে পারে কোনও গোষ্ঠী দলের ঘোষিত নীতি ও উদ্দেশ্য থেকে সরে গিয়েছে কি না। এরপর দলের নিজস্ব সংবিধান ও সাংগঠনিক কাঠামো বিবেচনা করা হয়। পরিস্থিতি অনুযায়ী শেষ পর্যন্ত দুই পক্ষের সাংগঠনিক এবং আইনসভার সংখ্যাগত শক্তিও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠতে পারে।

অর্থাৎ, কেবল কে বেশি বিধায়ক বা সাংসদ পেয়েছে—এমন একটি মাত্র সংখ্যার ভিত্তিতে প্রতিটি বিরোধের নিষ্পত্তি হয় না। মামলার সামগ্রিক তথ্য ও পরিস্থিতি বিবেচনা করেই কমিশন সিদ্ধান্ত নেয়।

এর আগে কোথায় Paragraph 15-এর প্রয়োগ হয়েছে?

ভারতীয় রাজনীতিতে দল ভাঙনের পর নাম ও প্রতীক নিয়ে একাধিকবার নির্বাচন কমিশনের সামনে একই ধরনের প্রশ্ন উঠেছে। শিবসেনা এবং ন্যাশনালিস্ট কংগ্রেস পার্টি (NCP)-র মতো দলের অভ্যন্তরীণ বিভাজনের ক্ষেত্রেও মূল দল ও প্রতীক নিয়ে কমিশনের সিদ্ধান্ত সামনে এসেছে।

শিবসেনার ক্ষেত্রে ২০২২ সালে দুই গোষ্ঠীর বিরোধ চলাকালীন কমিশন প্রথমে মূল নাম ও ‘Bow and Arrow’ প্রতীক স্থগিত করেছিল। পরে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়।

এই নজিরগুলিই বর্তমান তৃণমূল বিতর্কে Paragraph 15-এর গুরুত্ব বোঝার ক্ষেত্রে প্রাসঙ্গিক হয়ে উঠেছে।

এখন তৃণমূলের ক্ষেত্রে কী বাকি?

বর্তমান ব্যবস্থা চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নয়। নির্বাচন কমিশন জানিয়েছে, মূল নাম ও প্রতীকের দাবির বিষয়ে Paragraph 15-এর অধীনে substantive determination এখনও প্রয়োজন। অর্থাৎ, কোন গোষ্ঠীকে মূল স্বীকৃত দল হিসেবে বিবেচনা করা হবে, সেই প্রশ্ন এখনও চূড়ান্তভাবে নিষ্পত্তি হয়নি।

এদিকে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের নেতৃত্বাধীন গোষ্ঠী কমিশনের এই সিদ্ধান্তকে চ্যালেঞ্জ করে সুপ্রিম কোর্টের দ্বারস্থ হয়েছে। ফলে বিষয়টি এখন নির্বাচন কমিশনের প্রক্রিয়ার পাশাপাশি বিচারবিভাগীয় পর্যালোচনার ক্ষেত্রেও রয়েছে।

উপনির্বাচনের আগে কেন এত গুরুত্বপূর্ণ?

নন্দীগ্রাম ও রেজিনগর বিধানসভা আসনে ৬ অক্টোবর ২০২৬ উপনির্বাচন হওয়ার কথা। সেই নির্বাচন সামনে রেখেই কমিশন অন্তর্বর্তী ব্যবস্থা নিয়েছে, যাতে একই নাম ও প্রতীক নিয়ে দুই গোষ্ঠীর মধ্যে বিভ্রান্তি তৈরি না হয় এবং উভয় পক্ষ পৃথক পরিচয়ে নির্বাচনে অংশ নিতে পারে।

তাই Paragraph 15-এর অধীনে ভবিষ্যতের চূড়ান্ত সিদ্ধান্তের আগে বর্তমান অন্তর্বর্তী ব্যবস্থা মূলত নির্বাচনী প্রক্রিয়াকে এগিয়ে নিয়ে যাওয়ার একটি ব্যবস্থা হিসেবে কাজ করছে। মূল নাম ও ‘ফুল-ঘাস’ প্রতীকের চূড়ান্ত অধিকার কার হবে, সেই প্রশ্নের উত্তর এখনও Paragraph 15-এর অধীনে কমিশনের চূড়ান্ত সিদ্ধান্তের অপেক্ষায়।

Enjoyed this story? Share it.

Share

Keep reading

More in রাজনীতি

সব দেখুন
‘ভোটের অধিকার রক্ষা নয়, অনুপ্রবেশকারীদের বাঁচাতেই INDIA জোটের সমাবেশ’, দাবি অমিত শাহের
Breaking

রাজনীতি

‘ভোটের অধিকার রক্ষা নয়, অনুপ্রবেশকারীদের বাঁচাতেই INDIA জোটের সমাবেশ’, দাবি অমিত শাহের

INDIA জোটের সমাবেশকে কেন্দ্র করে বিরোধীদের নিশানা করলেন কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী অমিত শাহ। তাঁর দাবি, এই সমাবেশ ভোটারদের অধিকার রক্ষার জ…

1 min read
জেন-জি বিক্ষোভে ‘অরাজক শক্তির’ প্রভাবের আশঙ্কা আরএসএসের, তরুণদের সঙ্গে আলোচনার বার্তাও
Breaking

রাজনীতি

জেন-জি বিক্ষোভে ‘অরাজক শক্তির’ প্রভাবের আশঙ্কা আরএসএসের, তরুণদের সঙ্গে আলোচনার বার্তাও

জেন-জি প্রজন্মের বিক্ষোভ নিয়ে মন্তব্য করতে গিয়ে আরএসএসের সাধারণ সম্পাদক দত্তাত্রেয় হোসাবলে আশঙ্কা প্রকাশ করেছেন যে, কিছু ‘অরাজক শক্তি’ তর…

2 min read
‘অপরাধ নয়, শুধু অপরাধীদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা’: বিহারের মুখ্যমন্ত্রীর মন্তব্যে রাজনৈতিক বিতর্ক
Breaking

রাজনীতি

‘অপরাধ নয়, শুধু অপরাধীদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা’: বিহারের মুখ্যমন্ত্রীর মন্তব্যে রাজনৈতিক বিতর্ক

বিহারের মুখ্যমন্ত্রী সম্রাট চৌধুরীর ‘অপরাধ নয়, শুধু অপরাধ’ মন্তব্যকে কেন্দ্র করে রাজ্যে রাজনৈতিক বিতর্ক তৈরি হয়েছে। বিরোধী দলনেতা তেজস্বী…

1 min read
জম্মু-কাশ্মীরে মন্ত্রিসভার দপ্তর বণ্টনে রদবদল, আলি মহম্মদ সাগর পেলেন রাজস্ব ও আইন দপ্তর
Breaking

রাজনীতি

জম্মু-কাশ্মীরে মন্ত্রিসভার দপ্তর বণ্টনে রদবদল, আলি মহম্মদ সাগর পেলেন রাজস্ব ও আইন দপ্তর

জম্মু-কাশ্মীরের মুখ্যমন্ত্রী ওমর আবদুল্লাহর মন্ত্রিসভায় দপ্তর বণ্টনে পরিবর্তন আনা হয়েছে। আলি মহম্মদ সাগরকে রাজস্ব, বিদ্যুৎ উন্নয়ন, আইন ও…

1 min read
মণিপুরে কুকি-জো কাউন্সিলের হুঁশিয়ারি, বিধায়কদের প্রত্যাহার ও চুক্তি পুনর্বিবেচনার দাবি
Breaking

রাজনীতি

মণিপুরে কুকি-জো কাউন্সিলের হুঁশিয়ারি, বিধায়কদের প্রত্যাহার ও চুক্তি পুনর্বিবেচনার দাবি

মণিপুরে কুকি-জো কাউন্সিল রাজ্যে বেছে বেছে পদক্ষেপ নেওয়ার অভিযোগ তুলে অসন্তোষ প্রকাশ করেছে। সংগঠনটি কুকি-জো সম্প্রদায়ের বিধায়কদের প্রত্যাহ…

1 min read
‘৩-৪টি বাদে সব ভারতীয় ব্যবসায়ী আপনাদের ঘৃণা করেন’—নির্মলা সীতারামনের জবাবে রাহুল গান্ধী
Breaking

রাজনীতি

‘৩-৪টি বাদে সব ভারতীয় ব্যবসায়ী আপনাদের ঘৃণা করেন’—নির্মলা সীতারামনের জবাবে রাহুল গান্ধী

টাটা গোষ্ঠীকে কেন্দ্র করে সরকারের বিরুদ্ধে রাহুল গান্ধীর অভিযোগের পর অর্থমন্ত্রী নির্মলা সীতারামন ও লোকসভার বিরোধী দলনেতার মধ্যে বাকযুদ্ধ শু…

1 min read