বৈভবকে এবার বানাতে হবে সচিন! একেবারে কোমর বেঁধে নেমেছে BCCI-COE, রূপরেখা দিলেন বোর্ড সচিব
মাত্র ১৫ বছর বয়সেই ভারতীয় ক্রিকেটে ঝড় তোলা বৈভব সূর্যবংশীর ভবিষ্যৎ নিয়ে এবার বড় পরিকল্পনা করেছে BCCI। তাঁকে যাতে এক সিরিজ বা এক বছরের বিস্ময় হয়ে থেমে যেতে না হয়, বরং সচিন তেন্ডুলকরের মতো দীর্ঘ ও সফল আন্তর্জাতিক কেরিয়ার গড়তে পারেন, সেই লক্ষ্যেই দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা করছে বোর্ড। BCCI সচিব দেবজিৎ সইকিয়া জানিয়েছেন, বৈভবের প্রতিভাকে অত্যন্ত গুরুত্বের সঙ্গে দেখা হচ্ছে।
Written by
Priya Jana
মুম্বই: বয়স মাত্র ১৫। অথচ ইতিমধ্যেই আন্তর্জাতিক ক্রিকেটে নিজের ছাপ ফেলেছেন বৈভব সূর্যবংশী। ইংল্যান্ডের বিরুদ্ধে টি-২০ সিরিজে ভারতের হয়ে অভিষেক করে সবচেয়ে কম বয়সে পুরুষদের আন্তর্জাতিক ক্রিকেট খেলার রেকর্ড গড়েছেন তিনি। এবার এই বিস্ময় প্রতিভাকে ঘিরে আরও বড় স্বপ্ন দেখছে BCCI। লক্ষ্য একটাই—বৈভব যেন ক্ষণিকের বিস্ময় হয়ে হারিয়ে না যান, বরং ভারতীয় ক্রিকেটে দীর্ঘদিন রাজত্ব করতে পারেন।
বৃহস্পতিবার মুম্বইয়ে BCCI-এর সদর দফতরে ভারতীয় ক্রিকেটের ভবিষ্যৎ নিয়ে গুরুত্বপূর্ণ পর্যালোচনা বৈঠক হয়। সেই বৈঠকেই বৈভবের ভবিষ্যৎ নিয়েও আলোচনা হয়েছে। বোর্ড সচিব দেবজিৎ সইকিয়া জানিয়েছেন, বৈভবের মতো প্রতিভাকে অত্যন্ত সতর্কতার সঙ্গে এগিয়ে নিয়ে যেতে চায় BCCI।
‘এক সিরিজ বা এক বছরের বিস্ময় চাই না’
বৈভবকে নিয়ে BCCI-এর সবচেয়ে বড় চিন্তা তাঁর প্রতিভা নয়, বরং সেই প্রতিভাকে কীভাবে দীর্ঘদিন ধরে ধরে রাখা যায়। খুব কম বয়সে বিপুল সাফল্য পাওয়ার পর অনেক ক্রিকেটারই প্রত্যাশার চাপ, অতিরিক্ত ক্রিকেট এবং দ্রুত খ্যাতির ধাক্কায় পথ হারিয়েছেন।
সেই কারণেই বৈভবকে নিয়ে বোর্ডের পরিকল্পনা দীর্ঘমেয়াদি। সইকিয়ার বক্তব্য, তাঁরা চান না বৈভব ‘one-series or one-year wonder’ হয়ে থাকুন। বরং ভারতীয় ক্রিকেটে দীর্ঘ সময় ধরে অবদান রাখার মতো ক্রিকেটার হিসেবে তাঁকে গড়ে তুলতে চায় বোর্ড।
সচিনের উদাহরণ কেন?
বৈভবের সামনে আদর্শ হিসেবে উঠে আসছে সচিন তেন্ডুলকর। কারণ খুব অল্প বয়সে আন্তর্জাতিক ক্রিকেটে পা রেখেও সচিন প্রায় আড়াই দশক ভারতীয় ক্রিকেটের অন্যতম প্রধান স্তম্ভ ছিলেন।
BCCI সচিবের বক্তব্য, বৈভব বা তাঁর মতো প্রতিভাবান ক্রিকেটারদের এমনভাবে তৈরি করতে হবে যাতে তাঁরা সচিনের মতো দীর্ঘ সময় দেশের হয়ে খেলতে এবং নিজেদের সেরাটা দিতে পারেন।
অবশ্য এর অর্থ এই নয় যে BCCI এখনই বৈভবকে সচিনের সঙ্গে তুলনা করে ফেলছে। বরং দীর্ঘমেয়াদি কেরিয়ারের মডেল হিসেবে সচিনের স্থায়িত্ব ও ধারাবাহিকতাকে সামনে রাখা হচ্ছে।
COE-র নজরে বৈভব
BCCI-এর Centre of Excellence (COE)-ও বৈভবের উন্নয়নে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা নিতে চলেছে। বেঙ্গালুরুর COE-কে কেন্দ্র করে তরুণ ক্রিকেটারদের দীর্ঘমেয়াদি প্রস্তুতির পরিকল্পনা ইতিমধ্যেই তৈরি হয়েছে।
এর আগে জানা গিয়েছিল, COE-র পরিকল্পনায় অনূর্ধ্ব-২৫ প্রতিভাদের নিয়ে চার দিনের রেড-বল ম্যাচ আয়োজন করা হবে। লক্ষ্য, আগামী দশকের জন্য ভারতীয় টেস্ট ক্রিকেটের সম্ভাবনাময় ক্রিকেটারদের তৈরি করা। বৈভব এবং আয়ুষ মাত্রের মতো তরুণ প্রতিভারাও এই বৃহত্তর পরিকল্পনার অংশ।
অর্থাৎ বৈভবকে শুধু টি-২০ ক্রিকেটের বিস্ফোরক ব্যাটার হিসেবে নয়, দীর্ঘমেয়াদে সব ধরনের ক্রিকেটের জন্য তৈরি করার ভাবনাও রয়েছে।
আন্তর্জাতিক ক্রিকেটে অভিষেকেই রেকর্ড
বৈভবের উত্থান যে সাধারণ নয়, তার প্রমাণ মিলেছে একের পর এক রেকর্ডে। ২০২৬ সালে ইংল্যান্ডের বিরুদ্ধে টি-২০ সিরিজে ভারতীয় দলের জার্সিতে অভিষেক করে তিনি পুরুষদের আন্তর্জাতিক ক্রিকেটে ভারতের হয়ে খেলা সবচেয়ে কম বয়সী ক্রিকেটার হয়েছেন। এর ফলে সচিনের দীর্ঘদিনের রেকর্ডও ভেঙে যায়।
এর আগেই ঘরোয়া ক্রিকেট এবং আইপিএলে তাঁর বিস্ফোরক ব্যাটিং নজর কেড়েছিল। মাত্র ১৪ বছর বয়সে আইপিএলে সেঞ্চুরি করে তিনি বিশ্ব ক্রিকেটে আলোচনার কেন্দ্রে চলে আসেন।
শুধু প্রতিভা নয়, মানসিক প্রস্তুতিও গুরুত্বপূর্ণ
১৫ বছর বয়সে আন্তর্জাতিক ক্রিকেটের চাপ সামলানো সহজ নয়। প্রতিটি ইনিংসের পরেই তাঁর পারফরম্যান্স নিয়ে আলোচনা, সোশ্যাল মিডিয়ায় বিপুল প্রত্যাশা এবং ভবিষ্যতে আরও বড় কিছু করার চাপ—সবকিছুর মধ্যেই তাঁকে এগোতে হচ্ছে।
তাই BCCI-এর পরিকল্পনায় শুধুমাত্র ক্রিকেটীয় দক্ষতা নয়, সঠিক পরিবেশ, বিশ্রাম, ফিটনেস এবং ধাপে ধাপে উন্নতির বিষয়টিও গুরুত্ব পাচ্ছে। বোর্ড ইতিমধ্যেই তরুণ প্রতিভাদের জন্য হাই-পারফরম্যান্স ক্যাম্প এবং COE-ভিত্তিক প্রস্তুতির উপর জোর দিচ্ছে।
বৈভবের জন্য দরজা খুলছে সিনিয়র ক্রিকেটের
বৈভবের বয়স এখনও খুব কম। ফলে তাঁকে নিয়ে তাড়াহুড়ো করে সব ফরম্যাটে নিয়মিত খেলার চাপ তৈরি করতে চাইছে না BCCI। বরং ধাপে ধাপে তাঁকে সিনিয়র ক্রিকেটের পরিবেশের সঙ্গে মানিয়ে নেওয়ার পরিকল্পনা রয়েছে।
এর আগেও BCCI সচিব জানিয়েছিলেন, বৈভবকে সিনিয়র দলের পরিবেশের সঙ্গে স্বচ্ছন্দ করে তোলার জন্য বোর্ড প্রয়োজনীয় সহযোগিতা করবে। তাঁর বয়সের কথা মাথায় রেখে সফরে পরিবারের উপস্থিতির ব্যবস্থাও করা হয়েছিল।
লক্ষ্য শুধু আজকের তারকা নয়, আগামী দিনের কিংবদন্তি
বৈভবের ক্ষেত্রে BCCI-এর অবস্থান এখন বেশ পরিষ্কার। তাঁকে নিয়ে রাতারাতি বড় ঘোষণা নয়, বরং দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা। ক্রিকেটীয় পরিভাষায় বলতে গেলে, বোর্ড এখন বৈভবকে ‘ফিনিশড প্রোডাক্ট’ হিসেবে নয়, ভবিষ্যতের জন্য তৈরি হতে থাকা এক অসাধারণ প্রতিভা হিসেবেই দেখছে।
সইকিয়ার বক্তব্যেও সেই বার্তাই স্পষ্ট—বৈভবের মতো ক্রিকেটার যেন কয়েকটি দুর্দান্ত পারফরম্যান্সের পর হারিয়ে না যান। তাঁর প্রতিভাকে সঠিকভাবে পরিচর্যা করে এমন পর্যায়ে নিয়ে যেতে হবে, যাতে বহু বছর ভারতীয় ক্রিকেটকে পরিষেবা দিতে পারেন।
সচিনের মতো কেরিয়ার গড়া অবশ্যই বিরাট চ্যালেঞ্জ। কিন্তু বৈভব সূর্যবংশীর ক্ষেত্রে BCCI যে সেই দীর্ঘ পথের প্রস্তুতি এখন থেকেই শুরু করে দিতে চাইছে, সাম্প্রতিক পর্যালোচনা বৈঠকের বার্তা তেমনই।
