বঙ্গে হিন্দুত্বের প্রাতিষ্ঠানিক বিস্তার, বদলাচ্ছে সাংস্কৃতিক পরিসর
পশ্চিমবঙ্গে বিজেপির রাজনৈতিক উত্থানের পর হিন্দুত্ববাদী সংগঠনগুলির নজর এখন সাংস্কৃতিক ও বৌদ্ধিক পরিসরে। কলকাতার কলেজ স্ট্রিট, প্রকাশনা, থিয়েটার, চিত্রকলা, সঙ্গীত এবং ইতিহাসচর্চার মতো ক্ষেত্রগুলিতে একাধিক নতুন সংগঠন ও প্ল্যাটফর্ম গড়ে ওঠার মধ্য দিয়ে তৈরি হচ্ছে বিকল্প সাংস্কৃতিক পরিকাঠামো। এর ফলে বাংলার দীর্ঘদিনের সাংস্কৃতিক ও বৌদ্ধিক পরিসরে নতুন আদর্শগত প্রতিযোগিতা তৈরি হয়েছে।
লিখেছেন
Priya Jana
বাংলার সাংস্কৃতিক পরিসরে নতুন প্রাতিষ্ঠানিক লড়াই, নজরে বইপাড়া থেকে ইতিহাসচর্চা
পশ্চিমবঙ্গে বিজেপির ক্ষমতায় আসার পর রাজনীতির ময়দানের বাইরে আরও একটি গুরুত্বপূর্ণ পরিবর্তনের ইঙ্গিত মিলছে। হিন্দুত্ববাদী সংগঠন ও তাদের ঘনিষ্ঠ বিভিন্ন সাংস্কৃতিক প্ল্যাটফর্ম এখন বাংলার সাংস্কৃতিক ও বৌদ্ধিক পরিসরে নিজেদের প্রভাব বাড়ানোর চেষ্টা করছে। কলেজ স্ট্রিটের বইপাড়া থেকে প্রকাশনা, থিয়েটার, চিত্রকলা, সঙ্গীত এবং ইতিহাসচর্চা—একাধিক ক্ষেত্রে তৈরি হচ্ছে নতুন সংগঠন ও প্রতিষ্ঠান।
বিশ্লেষকদের মতে, এই উদ্যোগকে শুধুমাত্র রাজনৈতিক সম্প্রসারণ হিসেবে দেখলে বিষয়টির পুরো ছবি ধরা পড়বে না। দীর্ঘমেয়াদে সাংস্কৃতিক উৎপাদন, বৌদ্ধিক বিতর্ক এবং সামাজিক পরিচয়ের ওপর প্রভাব বিস্তার করার জন্য একটি বিকল্প প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামো গড়ে তোলাই এই উদ্যোগের বড় লক্ষ্য।
সাম্প্রতিক এক বিশ্লেষণে দেখা যাচ্ছে, ২০২৬ সালের বিধানসভা নির্বাচনের পর রাজনৈতিক পরিস্থিতি হিন্দুত্ববাদী সংগঠনগুলিকে আগের তুলনায় অনেক বেশি অনুকূল পরিবেশ দিয়েছে। এর ফলে দীর্ঘদিন ধরে তৈরি হওয়া সাংগঠনিক নেটওয়ার্ক এখন সাংস্কৃতিক ক্ষেত্রেও দৃশ্যমান হচ্ছে।
কলেজ স্ট্রিটে কেন নজর?
কলকাতার কলেজ স্ট্রিট শুধু বই বিক্রির বাজার নয়। দীর্ঘদিন ধরে এটি বাংলা ভাষা, সাহিত্য, রাজনীতি এবং বৌদ্ধিক বিতর্কের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ কেন্দ্র। সেই কারণে বাংলার সাংস্কৃতিক আধিপত্যের প্রশ্নে কলেজ স্ট্রিটের আলাদা প্রতীকী গুরুত্ব রয়েছে।
২০২৬ সালে Bangiya Grantha Shilpa Parishad এবং Association of Bengal for Literature & Culture-এর মতো নতুন সংগঠনের আত্মপ্রকাশ সেই পরিসরে নতুন প্রতিযোগিতার ইঙ্গিত দিয়েছে। সংগঠনগুলির পক্ষ থেকে নিজেদের অরাজনৈতিক বা সর্বজনীন প্ল্যাটফর্ম হিসেবে তুলে ধরা হলেও, তাদের সঙ্গে যুক্ত ব্যক্তিদের আদর্শগত অবস্থান এবং বিভিন্ন কর্মসূচি নিয়ে ইতিমধ্যেই রাজনৈতিক বিতর্ক তৈরি হয়েছে।
কলকাতা আন্তর্জাতিক বইমেলার মতো বৃহৎ সাংস্কৃতিক মঞ্চ নিয়েও ভবিষ্যতে এই প্রতিযোগিতা আরও তীব্র হতে পারে বলে মনে করা হচ্ছে। ফলে বই প্রকাশ ও বিপণনের পাশাপাশি ‘কে বাংলার সাংস্কৃতিক বয়ান তৈরি করবে’—সেই প্রশ্নটিও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠছে।
শুধু বই নয়, শিল্প ও থিয়েটারেও সংগঠন
হিন্দুত্ববাদী সাংস্কৃতিক পরিসর তৈরির উদ্যোগ বইপাড়াতেই সীমাবদ্ধ থাকছে না। চিত্রশিল্পী ও অন্যান্য শিল্পীদের জন্য Shyamaprasad Artist Forum এবং Bangiya Shilpa Kala Parishad-এর মতো প্ল্যাটফর্ম তৈরি হয়েছে।
থিয়েটারের ক্ষেত্রেও Paschimbanga Natya Parishad-এর মতো সংগঠনের আত্মপ্রকাশ নতুন সাংস্কৃতিক মেরুকরণের সম্ভাবনা তৈরি করেছে। একইভাবে Paschimbanga Charukala Parishad-এর মতো উদ্যোগের মাধ্যমে ভিজ্যুয়াল আর্টের ক্ষেত্রেও একটি বিকল্প নেটওয়ার্ক তৈরির চেষ্টা চলছে বলে সাম্প্রতিক প্রতিবেদনে উঠে এসেছে।
এর আগে অবশ্য বাংলায় হিন্দুত্ববাদী সংগঠনগুলির সাংস্কৃতিক প্রভাব বিস্তারের চেষ্টা ছিল। কিন্তু দীর্ঘ সময় ধরে মূলধারার সাংস্কৃতিক প্রতিষ্ঠানগুলির কেন্দ্রে তাদের উপস্থিতি সীমিত ছিল। নতুন রাজনৈতিক পরিস্থিতি সেই সীমাবদ্ধতা কাটানোর সুযোগ তৈরি করেছে।
ইতিহাসের ব্যাখ্যা নিয়েও লড়াই
বাংলার সাংস্কৃতিক রাজনীতিতে ইতিহাসচর্চা একটি গুরুত্বপূর্ণ ক্ষেত্র। হিন্দুত্ববাদী সংগঠনগুলি দীর্ঘদিন ধরেই ভারতীয় ইতিহাসের বিকল্প ব্যাখ্যা সামনে আনার চেষ্টা করেছে। Akhil Bharatiya Itihas Sankalan Yojana-র সঙ্গে যুক্ত বিভিন্ন উদ্যোগ বাংলাতেও বহু বছর ধরে ইতিহাস বিষয়ক আলোচনা, সেমিনার এবং প্রকাশনার কাজ করেছে।
২০২৬ সালে এই ক্ষেত্রেও নতুন সংগঠন ও প্ল্যাটফর্মের সক্রিয়তা বেড়েছে। Rashtriya Lekhak Manch-এর মতো সাহিত্যিক প্ল্যাটফর্ম এবং Foundation for Historical Studies-এর মতো উদ্যোগের মাধ্যমে ইতিহাস ও সাহিত্য নিয়ে একটি পৃথক বৌদ্ধিক পরিসর গড়ে তোলার চেষ্টা চলছে।
এই প্রবণতার কেন্দ্রে রয়েছে একটি বড় আদর্শগত প্রশ্ন—বাংলার ইতিহাসকে কোন দৃষ্টিভঙ্গি থেকে ব্যাখ্যা করা হবে?
RSS-এর দীর্ঘমেয়াদি সাংগঠনিক বিস্তার
এই সাংস্কৃতিক উদ্যোগকে বুঝতে গেলে পশ্চিমবঙ্গে RSS-এর দীর্ঘমেয়াদি সাংগঠনিক বিস্তারও বিবেচনায় রাখতে হয়। একটি সাম্প্রতিক গবেষণায় উল্লেখ করা হয়েছে, ২০১১ থেকে ২০২৪ সালের মধ্যে পশ্চিমবঙ্গে RSS-এর শাখার সংখ্যা প্রায় ১,০০০ থেকে বেড়ে প্রায় ২,০০০ হয়েছে। একই সময়ে RSS-ঘনিষ্ঠ বিদ্যালয় এবং সামাজিক পরিষেবা প্রকল্পের সংখ্যাও উল্লেখযোগ্যভাবে বৃদ্ধি পেয়েছে।
গবেষণায় আরও বলা হয়েছে, জঙ্গলমহল, উত্তরবঙ্গ, সুন্দরবনের বিস্তীর্ণ অঞ্চল এবং বাংলাদেশ সীমান্তবর্তী এলাকাগুলিতে এই সামাজিক ও সাংগঠনিক কাজ বিশেষ গুরুত্ব পেয়েছে। এই অঞ্চলগুলির অনেকগুলিতেই পরবর্তীতে বিজেপির নির্বাচনী বিস্তারও লক্ষ্য করা গেছে।
অর্থাৎ সাংস্কৃতিক ক্ষেত্রের বর্তমান উদ্যোগকে বিচ্ছিন্ন ঘটনা হিসেবে না দেখে দীর্ঘদিনের সামাজিক ও সাংগঠনিক বিস্তারের পরবর্তী ধাপ হিসেবেও দেখা হচ্ছে।
আদিবাসী সমাজেও সাংস্কৃতিক প্রভাবের প্রশ্ন
পশ্চিমবঙ্গের আদিবাসী এলাকায় RSS-ঘনিষ্ঠ শিক্ষা ও সামাজিক সংগঠনগুলির কাজ নিয়েও বহু বছর ধরে বিতর্ক রয়েছে। ২০১৬ সালের একটি প্রতিবেদনে পশ্চিম মেদিনীপুরের আদিবাসী এলাকায় RSS-ঘনিষ্ঠ বিদ্যালয়ে হিন্দু ধর্মীয় প্রার্থনা ও সাংস্কৃতিক উপাদান ব্যবহারের বিষয়টি উঠে এসেছিল। কিছু আদিবাসী পরিবারের অভিযোগ ছিল, এর ফলে তাদের নিজস্ব ভাষা ও সংস্কৃতির ওপর চাপ তৈরি হচ্ছে। অন্যদিকে সংগঠনগুলির বক্তব্য ছিল, তাদের কাজ মূলত শিক্ষা ও সামাজিক উন্নয়নকেন্দ্রিক।
এই বিতর্ক দেখায়, বাংলায় সাংস্কৃতিক প্রভাব বিস্তারের প্রশ্নটি শুধু কলকাতার মধ্যবিত্ত বৌদ্ধিক পরিসরে সীমাবদ্ধ নয়। গ্রাম, আদিবাসী অঞ্চল এবং সামাজিকভাবে প্রান্তিক এলাকাতেও সাংস্কৃতিক পরিচয় একটি গুরুত্বপূর্ণ রাজনৈতিক ক্ষেত্র হয়ে উঠেছে।
‘বিকল্প সংস্কৃতি’ বনাম পুরনো সাংস্কৃতিক আধিপত্য
হিন্দুত্ববাদী শিবিরের একটি গুরুত্বপূর্ণ অভিযোগ হল, বাংলার সাংস্কৃতিক ও বৌদ্ধিক প্রতিষ্ঠানগুলিতে দীর্ঘদিন ধরে বামপন্থী ও তথাকথিত ‘সেকুলার’ চিন্তার আধিপত্য রয়েছে। সেই আধিপত্যের পাল্টা হিসেবে একটি ‘জাতীয়তাবাদী’ সাংস্কৃতিক পরিসর তৈরির চেষ্টা চলছে।
সমালোচকদের মতে, এই প্রক্রিয়া সাংস্কৃতিক বহুত্বের জন্য নতুন চ্যালেঞ্জ তৈরি করতে পারে। আবার হিন্দুত্ববাদী সংগঠনগুলির বক্তব্যের পক্ষে থাকা মহলের যুক্তি, দীর্ঘদিন ধরে সাংস্কৃতিক প্রতিষ্ঠানের বাইরে থাকা একটি বৃহৎ সামাজিক অংশকে সংগঠিত করার জন্য বিকল্প প্রতিষ্ঠান প্রয়োজন।
এই দ্বন্দ্বই আগামী দিনে বাংলার সাংস্কৃতিক রাজনীতির অন্যতম প্রধান ক্ষেত্র হয়ে উঠতে পারে।
সামনে কী?
বাংলায় হিন্দুত্বের সাংস্কৃতিক বিস্তার এখন আর শুধুমাত্র নির্বাচনী সভা, ধর্মীয় অনুষ্ঠান বা রাজনৈতিক প্রচারের মধ্যে সীমাবদ্ধ নেই। বই প্রকাশ, সাহিত্যচর্চা, থিয়েটার, শিল্পকলা, সঙ্গীত এবং ইতিহাসের মতো ক্ষেত্রগুলিতে প্রতিষ্ঠান তৈরি করে দীর্ঘমেয়াদি প্রভাব বিস্তারের চেষ্টা স্পষ্ট হচ্ছে।
তবে এই উদ্যোগ কতটা স্থায়ী হবে, তা এখনই বলা কঠিন। নতুন সংগঠনগুলির মধ্যে পারস্পরিক প্রতিযোগিতা, নেতৃত্বের দ্বন্দ্ব এবং রাজনৈতিক ঘনিষ্ঠতার প্রশ্ন ভবিষ্যতে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠতে পারে।
একইসঙ্গে বাংলার পুরনো সাংস্কৃতিক প্রতিষ্ঠানগুলিও নতুন বাস্তবতার মুখোমুখি। শুধু রাজনৈতিক বিরোধিতা নয়, সাধারণ মানুষের সাংস্কৃতিক চাহিদা, প্রান্তিক সমাজের প্রতিনিধিত্ব এবং নতুন প্রজন্মের সঙ্গে সংযোগ—এই প্রশ্নগুলির উত্তরও তাদের দিতে হবে।
ফলে বাংলায় আগামী দিনের সাংস্কৃতিক লড়াই কেবল ‘কে ক্ষমতায়’ সেই প্রশ্নে সীমাবদ্ধ থাকবে না। আরও বড় প্রশ্ন হবে—কে সাংস্কৃতিক প্রতিষ্ঠান তৈরি করবে, কে ইতিহাসের ব্যাখ্যা দেবে এবং শেষ পর্যন্ত বাংলার পরিচয়কে কোন ভাষায় সংজ্ঞায়িত করবে।
Keep reading
More in রাজনীতি
রাজনীতি
১০০ দিনেই বড় ঘোষণা: অতীত সরকারের নীতি-দুর্নীতি খতিয়ে দেখতে ৩ কমিটি, Zee 24 Ghanta Conclave-এ সুদেন্দু অধিকারী
সরকারের ১০০ দিন পূর্তি উপলক্ষে Zee 24 Ghanta-র ‘সরকারের ১০০ দিন’ মেগা কনক্লেভে একাধিক গুরুত্বপূর্ণ ঘোষণা করলেন পশ্চিমবঙ্গের মুখ্যমন্ত্রী সুদ…
রাজনীতি
পশ্চিমবঙ্গে ভোটার তালিকায় বড় আপডেট: ২৭ লক্ষ নাম বাদ, আপিল করেছেন কতজন?
পশ্চিমবঙ্গে ভোটার তালিকার বিশেষ নিবিড় সংশোধন বা SIR নিয়ে নতুন করে চর্চা শুরু হয়েছে। নির্বাচন কমিশনের তথ্য অনুযায়ী, ‘লজিক্যাল ডিসক্রেপেন্সি’…
রাজনীতি
তামিলনাড়ুতে প্রতিবাদ-বিরোধী সার্কুলার নিয়ে বিতর্ক, মুখ্যসচিবের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা চাইল CPI(M)
প্রতিবাদ ও বিক্ষোভ নিয়ন্ত্রণ সংক্রান্ত একটি সার্কুলারকে কেন্দ্র করে তামিলনাড়ুতে নতুন করে রাজনৈতিক বিতর্ক তৈরি হয়েছে। সার্কুলার নিয়ে আপত্…
রাজনীতি
‘পিতৃতন্ত্র ভাঙা’ মন্তব্যে রাহুলকে নিশানা বিজেপির, ‘কংগ্রেস থেকেই শুরু নয়?’
পুণের ‘ছাত্রোঁ কি গুঞ্জ’ কর্মসূচিতে মহিলাদের উদ্দেশে রাহুল গান্ধীর ‘Smash the Patriarchy’ বার্তা ঘিরে বিজেপি-কংগ্রেস সংঘাত নতুন মাত্রা পেয়েছ…
রাজনীতি
দুধ গরম করা নিয়ে বিতর্ক: ফুটপাথবাসী মহিলার পাশে শুভেন্দু, নতুন থাকার জায়গার ব্যবস্থা
দুধ গরম করা নিয়ে তৈরি হওয়া বিতর্কের আবহে ফুটপাথবাসী এক মহিলার সঙ্গে দেখা করলেন বিরোধী দলনেতা শুভেন্দু অধিকারী। তাঁর অভিযোগ ও পরিস্থিতি খতিয়ে…
রাজনীতি
BJP Parliamentary Board Rejig: পার্লামেন্টারি বোর্ডে বড় রদবদল, জায়গা পেতে পারেন ৪ মুখ্যমন্ত্রী
বিজেপির সর্বোচ্চ সিদ্ধান্ত গ্রহণকারী সংস্থা পার্লামেন্টারি বোর্ডে শীঘ্রই বড় রদবদল হতে পারে। দলের নতুন সাংগঠনিক কাঠামো ঘোষণার পর এবার নজর পড…
