ট্রাম্পকে সামলাতে একের পর এক চুক্তি, মোদীর নতুন কৌশলে বদলাচ্ছে ভারতের বিদেশনীতি
মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের বাণিজ্যনীতি, রাশিয়ার সঙ্গে ভারতের সম্পর্ক এবং সম্ভাব্য শুল্কের চাপের মধ্যে ভারত তার কূটনৈতিক ও অর্থনৈতিক বিকল্প বাড়াচ্ছে। একাধিক দেশের সঙ্গে নির্দিষ্ট বাণিজ্য, প্রতিরক্ষা, প্রযুক্তি ও জ্বালানি চুক্তির মাধ্যমে মার্কিন নির্ভরতা কমিয়ে ‘স্ট্র্যাটেজিক অটোনমি’ বজায় রাখাই নরেন্দ্র মোদী সরকারের বড় লক্ষ্য বলে মনে করা হচ্ছে।
লিখেছেন
Priya Jana
ট্রাম্পের অনিশ্চয়তার মধ্যে একের পর এক চুক্তি, বিকল্প পথ তৈরি করছে ভারত
মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের দ্বিতীয় দফার নীতির অনিশ্চয়তা আন্তর্জাতিক বাণিজ্য ও কূটনীতিতে নতুন সমীকরণ তৈরি করেছে। এই পরিস্থিতিতে প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদীর নেতৃত্বাধীন ভারত একদিকে ওয়াশিংটনের সঙ্গে বাণিজ্য আলোচনার পথ খোলা রাখছে, অন্যদিকে বিশ্বের বিভিন্ন শক্তিধর ও মধ্যম শক্তির দেশের সঙ্গে একের পর এক নির্দিষ্ট চুক্তি করে নিজের কূটনৈতিক ও অর্থনৈতিক বিকল্প বাড়াচ্ছে।
সাম্প্রতিক সময়ে ভারতের বিদেশনীতি তাই শুধু ‘একটি বড় শক্তির সঙ্গে সম্পর্ক’-এর মধ্যে সীমাবদ্ধ না থেকে বহুমুখী অংশীদারিত্বের দিকে এগোচ্ছে। নিউ ইয়র্ক টাইমসের সাম্প্রতিক বিশ্লেষণেও মোদী সরকারের এই কৌশলকে ট্রাম্প-পরবর্তী অনিশ্চয়তার বিরুদ্ধে ঝুঁকি ছড়িয়ে দেওয়ার প্রচেষ্টা হিসেবে তুলে ধরা হয়েছে।
কেন এত দ্রুত নতুন অংশীদার খুঁজছে দিল্লি?
ভারতের জন্য আমেরিকা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ বাণিজ্যিক অংশীদার। কিন্তু ট্রাম্প প্রশাসনের শুল্কনীতি এবং রাশিয়া থেকে ভারতের অপরিশোধিত তেল কেনা নিয়ে ওয়াশিংটনের চাপ পরিস্থিতিকে জটিল করেছে।
আগস্টে মার্কিন সেনেটে এমন একটি বিলও এগিয়েছে, যার মাধ্যমে রুশ জ্বালানি কিনতে থাকা দেশগুলির বিরুদ্ধে বড় ধরনের শুল্ক আরোপের সুযোগ তৈরি হতে পারে। ভারত এই পরিস্থিতি নিয়ে উদ্বিগ্ন হলেও ওয়াশিংটনের সঙ্গে বাণিজ্য আলোচনা চালিয়ে যাচ্ছে।
এই চাপের মধ্যেই দিল্লির কৌশল হচ্ছে—আমেরিকার সঙ্গে সম্পর্ক নষ্ট না করে একইসঙ্গে ইউরোপ, এশিয়া, মধ্যপ্রাচ্য এবং অন্যান্য অঞ্চলে অর্থনৈতিক ও কৌশলগত সম্পর্ক আরও গভীর করা।
ফ্রান্স থেকে ইউরোপীয় ইউনিয়ন, একাধিক দরজা খুলছে
ভারত-ফ্রান্স সম্পর্কের ক্ষেত্রে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা, প্রযুক্তি ও বাণিজ্যকে বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে। একইসঙ্গে ইউরোপীয় ইউনিয়নের সঙ্গে ভারতের বাণিজ্যিক সম্পর্কও নতুন পর্যায়ে পৌঁছেছে।
ইউরোপীয় ইউনিয়নের সঙ্গে ভারতের মুক্ত বাণিজ্য চুক্তি দুই দশকের বেশি সময় ধরে চলা আলোচনার পর নতুন গতি পেয়েছে। এর মাধ্যমে ইউরোপের বিশাল বাজারে ভারতীয় পণ্য ও পরিষেবার জন্য আরও সুযোগ তৈরি করার চেষ্টা চলছে। বিনিময়ে ভারতও ইউরোপীয় পণ্যের ক্ষেত্রে কিছু শুল্ক কমানোর মতো পদক্ষেপ নিতে সম্মত হয়েছে।
অর্থাৎ, মার্কিন বাজারে কোনও নীতিগত পরিবর্তনের ধাক্কা এলে ইউরোপীয় বাজারকে বিকল্প হিসেবে আরও শক্তিশালী করে তোলাই দিল্লির অন্যতম লক্ষ্য।
প্রতিরক্ষা ও প্রযুক্তিতেও বহুমুখী কৌশল
ভারতের এই নতুন কৌশল শুধু বাণিজ্যে সীমাবদ্ধ নয়। প্রতিরক্ষা প্রযুক্তি, জাহাজ নির্মাণ, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা, গুরুত্বপূর্ণ খনিজ এবং জ্বালানি নিরাপত্তাকেও এর আওতায় আনা হয়েছে।
জার্মানির সঙ্গে সাবমেরিন প্রযুক্তি, দক্ষিণ কোরিয়ার সঙ্গে বিনিয়োগ ও জাহাজ নির্মাণ সহযোগিতা এবং নিউজিল্যান্ডের সঙ্গে সামুদ্রিক নিরাপত্তা ও বাণিজ্য নিয়ে আলোচনা ভারতের বৃহত্তর কৌশলের অংশ।
বিশেষজ্ঞদের মতে, এর ফলে ভারত একদিকে নিজের উৎপাদন ক্ষমতা ও প্রযুক্তিগত দক্ষতা বাড়াতে পারবে, অন্যদিকে কোনও একটি দেশের ওপর অতিরিক্ত নির্ভরতার ঝুঁকিও কমবে।
রাশিয়ার সঙ্গে সম্পর্কও পুরোপুরি ছাড়ছে না ভারত
ট্রাম্প প্রশাসনের চাপ সত্ত্বেও রাশিয়ার সঙ্গে ভারতের সম্পর্ক এখনও গুরুত্বপূর্ণ। বিশেষ করে জ্বালানি নিরাপত্তার ক্ষেত্রে রাশিয়া ভারতের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ সরবরাহকারী হয়ে রয়েছে।
জুলাই ২০২৬-এ ভারতের মোট অপরিশোধিত তেল আমদানির প্রায় ৫০.৮৩ শতাংশই রাশিয়া থেকে এসেছিল বলে রয়টার্স জানিয়েছে। মধ্যপ্রাচ্যের সরবরাহে অস্থিরতা এবং হরমুজ প্রণালীর পরিস্থিতির কারণে ভারতীয় রিফাইনারিগুলি রুশ তেলের ওপর আরও নির্ভর করেছে।
ফলে দিল্লির সামনে দ্বৈত চ্যালেঞ্জ—একদিকে রাশিয়ার সঙ্গে পুরনো কৌশলগত সম্পর্ক বজায় রাখা, অন্যদিকে আমেরিকার সঙ্গে বাণিজ্যিক সম্পর্ক এবং শুল্ক আলোচনাকে এগিয়ে নিয়ে যাওয়া।
আমেরিকার সঙ্গে দরজা বন্ধ করছে না মোদী সরকার
তবে ভারত যে ওয়াশিংটন থেকে দূরে সরে যাচ্ছে, এমনটা বলা এখনও ঠিক হবে না। বরং দিল্লির কৌশলকে ‘আমেরিকা অথবা অন্য কেউ’—এই দ্বিমুখী পছন্দের বদলে ‘আমেরিকার পাশাপাশি অন্য অংশীদার’ হিসেবে দেখা হচ্ছে।
ফেব্রুয়ারিতে ভারত ও আমেরিকা একটি অন্তর্বর্তী বাণিজ্য চুক্তির কাঠামোয় পৌঁছেছিল। সেই সময় মার্কিন প্রশাসন ভারতের ওপর আরোপিত অতিরিক্ত ২৫ শতাংশ রাশিয়া-সংক্রান্ত শুল্ক তুলে নেওয়ার ঘোষণা করে এবং পারস্পরিক শুল্কের হার ২৫ শতাংশ থেকে ১৮ শতাংশে নামানোর কথা জানায়।
পরবর্তী সময়ে রুশ তেল নিয়ে নতুন করে মার্কিন চাপ তৈরি হলেও ভারত-আমেরিকা বাণিজ্য আলোচনা চালু রয়েছে। ভারতের বাণিজ্য সচিবও জানিয়েছেন, আলোচনায় শুল্কের পূর্বানুমেয়তা দিল্লির কাছে গুরুত্বপূর্ণ।
‘স্ট্র্যাটেজিক অটোনমি’ই মূল লক্ষ্য?
বিদেশনীতি বিশেষজ্ঞদের মতে, ভারতের সাম্প্রতিক পদক্ষেপের কেন্দ্রে রয়েছে ‘স্ট্র্যাটেজিক অটোনমি’ বা কৌশলগত স্বাধীনতা। অর্থাৎ, আমেরিকার সঙ্গে ঘনিষ্ঠতা বজায় রেখেও ভারত যাতে রাশিয়া, ইউরোপ, জাপান, দক্ষিণ কোরিয়া, অস্ট্রেলিয়া কিংবা অন্যান্য দেশের সঙ্গে প্রয়োজন অনুযায়ী সম্পর্ক রাখতে পারে।
এই নীতির অর্থ আমেরিকাবিরোধিতা নয়। বরং কোনও একটি শক্তির সিদ্ধান্ত যাতে ভারতের অর্থনীতি, জ্বালানি নিরাপত্তা বা সরবরাহ ব্যবস্থাকে বড় ধাক্কা দিতে না পারে, সেই জন্য আগেভাগেই বিকল্প তৈরি করা।
মোদীর কূটনীতিতে ‘এক চুক্তি করে এক ধাপ এগোনো’
সাম্প্রতিক বিদেশ সফর ও দ্বিপাক্ষিক আলোচনার দিকে তাকালে দেখা যাচ্ছে, ভারতের কূটনীতিতে বড় ঘোষণার পাশাপাশি নির্দিষ্ট লক্ষ্যভিত্তিক চুক্তির ওপর জোর বাড়ছে। কোথাও বাণিজ্য, কোথাও প্রতিরক্ষা প্রযুক্তি, কোথাও জ্বালানি, আবার কোথাও কর্মসংস্থান ও বিনিয়োগ—প্রতিটি ক্ষেত্রেই আলাদা অংশীদার তৈরি করা হচ্ছে।
এই কৌশল শেষ পর্যন্ত ভারতকে ট্রাম্প প্রশাসনের নীতিগত পরিবর্তনের ধাক্কা সামলাতে কতটা সাহায্য করবে, তা সময়ই বলবে। তবে একটি বিষয় স্পষ্ট—ওয়াশিংটনের ওপর একক নির্ভরতার বদলে একাধিক আন্তর্জাতিক অংশীদার তৈরি করে নিজের দর-কষাকষির ক্ষমতা বাড়াতে চাইছে দিল্লি।
ট্রাম্পের আমেরিকার সঙ্গে সম্পর্ক বজায় রেখেই ইউরোপ, এশিয়া ও অন্যান্য শক্তির সঙ্গে নতুন সমীকরণ তৈরি—নরেন্দ্র মোদীর বর্তমান বিদেশনীতির এই ভারসাম্যের কৌশল আগামী দিনে ভারতের অর্থনীতি ও কূটনীতির জন্য গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠতে পারে।
Keep reading
More in আন্তর্জাতিক
আন্তর্জাতিক
ইউরোপের সঙ্গে কোনও সংঘাতের প্রস্তুতি নেই, ইউক্রেন নিয়ে আলোচনার দরজাও খোলা: পুতিন
রুশ প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিন বলেছেন, ইউরোপের সঙ্গে কোনও ধরনের সামরিক সংঘাতের জন্য রাশিয়া প্রস্তুতি নিচ্ছে না। একইসঙ্গে ইউক্রেন যুদ্ধের অব…
আন্তর্জাতিক
কে শন সাকাইডা? প্রাক্তন Moanalua High School wrestling coach-এর বিরুদ্ধে শিশু পর্নোগ্রাফি মামলায় অভিযোগ
হাওয়াইয়ের Moanalua High School-এর প্রাক্তন girls wrestling coach শন সাকাইডাকে শিশু পর্নোগ্রাফি সংক্রান্ত অভিযোগে গ্রেফতার করেছে FBI। ৪৪ বছর…
আন্তর্জাতিক
কে এই জেন স্মিথ? ‘Lake America’ লেখা AI ছবির বিতর্কে চাকরি গেল মিশিগানের CEO-র
মিশিগানের Family First Credit Union-এর CEO জেন স্মিথ একটি AI-এডিট করা পারিবারিক ছবি সোশ্যাল মিডিয়ায় পোস্ট করার পর বিতর্কে জড়ান। ছবিতে পরিবা…
আন্তর্জাতিক
বীভৎস টাইফুন দুজুয়ানে বিদ্যুৎবিচ্ছিন্ন ৫০ হাজার, সরিয়ে নেওয়া হচ্ছে ২০ লক্ষ বাসিন্দাকে! কত মৃত্যু? নিখোঁজ?
জাপানে তাণ্ডব চালানো টাইফুন দুজুয়ানের প্রভাবে পূর্বাঞ্চলে ভয়াবহ বন্যা ও ভূমিধসের ঘটনা ঘটেছে। ২৩ সেপ্টেম্বরের সর্বশেষ আপডেট অনুযায়ী, মৃতের সং…
আন্তর্জাতিক
ইমরান সমর্থকদের মিছিলে গুলি, মন্ত্রীকে অপহরণ! ক্রমশ গৃহযুদ্ধের দিকে পাকিস্তান?
পাকিস্তানে প্রাক্তন প্রধানমন্ত্রী ইমরান খানের দল PTI-র ২৭ সেপ্টেম্বরের ইসলামাবাদ মিছিল ঘিরে উত্তেজনা তুঙ্গে। খাইবার পাখতুনখোয়ায় প্রাদেশিক মন…
আন্তর্জাতিক
'আমরা জিতলে এটা ভেঙে ফেলব'! কেন এত রাগ ৯০ ফুটের হনুমানমূর্তির উপর? রাজনৈতিক বিতর্কের কেন্দ্রে...
আমেরিকার টেক্সাসের সুগার ল্যান্ডে ৯০ ফুটের হনুমানমূর্তি ঘিরে ফের রাজনৈতিক বিতর্ক তৈরি হয়েছে। রক্ষণশীল ইউটিউবার জেসি হিউজেস সোশ্যাল মিডিয়ায় ল…
