‘তিস্তা চিনের হাতে, আকাশে চিনা যুদ্ধবিমান!’ দেশে ফেরার আগে বাংলাদেশকে নিয়ে বিস্ফোরক মন্তব্য শেখ হাসিনার
ভারতে অবস্থানরত বাংলাদেশের প্রাক্তন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা দেশে ফেরার ইচ্ছার কথা জানিয়ে বাংলাদেশে চিনের বাড়তে থাকা প্রভাব নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন। তিস্তা প্রকল্পে চিনের ভূমিকা এবং চিনা J-10CE যুদ্ধবিমান কেনার পরিকল্পনা নিয়েও সরব হয়েছেন তিনি। তাঁর প্রশ্ন, অর্থনৈতিক সঙ্কটের মধ্যে এত বড় প্রতিরক্ষা ব্যয়ের প্রয়োজন কোথায়?
লিখেছেন
Priya Jana
নয়াদিল্লি: বাংলাদেশে ফিরতে চান তিনি—এমনই বার্তা দিলেন প্রাক্তন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। ভারতীয় সংবাদমাধ্যমকে দেওয়া এক টেলিফোনিক সাক্ষাৎকারে তিনি জানিয়েছেন, ডিসেম্বরের মধ্যে দেশে ফেরার ইচ্ছা রয়েছে তাঁর। তবে নির্দিষ্ট দিন, সময় ও কোথা দিয়ে দেশে প্রবেশ করবেন, তা পরে জানাবেন বলে জানিয়েছেন হাসিনা।
এই সাক্ষাৎকারেই বাংলাদেশের বর্তমান সরকারের চিন-ঘনিষ্ঠ নীতি নিয়ে একাধিক প্রশ্ন তুলেছেন আওয়ামি লিগ নেত্রী। বিশেষ করে তিস্তা নদী প্রকল্প এবং চিনা যুদ্ধবিমান কেনার পরিকল্পনা নিয়ে তাঁর বক্তব্য নতুন করে রাজনৈতিক ও কূটনৈতিক আলোচনার জন্ম দিয়েছে।
তিস্তা প্রকল্পে চিনের ভূমিকা নিয়ে প্রশ্ন
শেখ হাসিনা জানিয়েছেন, তাঁর সরকারের সময়ে তিস্তা নদীর উন্নয়ন ও ব্যবস্থাপনা নিয়ে ভারতের সঙ্গে কাজ করার বিষয়ে আলোচনা হয়েছিল। কিন্তু বর্তমানে বাংলাদেশ চিনের সঙ্গে এই প্রকল্পে এগোচ্ছে। বিষয়টি নিয়ে ভারতীয় উদ্বেগ তৈরি হয়েছে বলেও সাক্ষাৎকারে প্রশ্ন ওঠে।
তিস্তা নদীর জল ব্যবস্থাপনা বাংলাদেশের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। প্রকল্পটির আওতায় নদী ব্যবস্থাপনা, জল সংরক্ষণ, নদীখাত সংস্কার এবং বন্যা নিয়ন্ত্রণের মতো কাজের পরিকল্পনা রয়েছে। বাংলাদেশের বর্তমান প্রশাসন চিনকে এই প্রকল্পে যুক্ত করার বিষয়ে এগিয়েছে। ২০২৫ সালে চিনের সঙ্গে বাংলাদেশের যৌথ বিবৃতিতেও তিস্তা নদী ব্যবস্থাপনা ও পুনরুদ্ধার প্রকল্পে বেজিংয়ের অংশগ্রহণের কথা স্পষ্টভাবে উঠে এসেছিল।
‘এত টাকা দিয়ে যুদ্ধবিমান কেন?’
শেখ হাসিনার সবচেয়ে তীব্র প্রশ্ন উঠেছে বাংলাদেশের চিনা J-10CE যুদ্ধবিমান কেনার পরিকল্পনা নিয়ে।
সাম্প্রতিক রিপোর্ট অনুযায়ী, বাংলাদেশ চিনের কাছ থেকে J-10CE যুদ্ধবিমান কেনার বিষয়ে এগোচ্ছে। বিভিন্ন প্রতিবেদনে প্রায় ২.২ থেকে ২.৩ বিলিয়ন ডলারের সম্ভাব্য চুক্তি এবং ২০ থেকে ২৪টি বিমান কেনার কথা উঠে এসেছে।
এই প্রসঙ্গেই হাসিনা বাংলাদেশের বর্তমান অর্থনৈতিক পরিস্থিতির কথা তুলে ধরে প্রশ্ন করেন—দেশে বিদ্যুৎ ও গ্যাসের ঘাটতি রয়েছে, সার কারখানা বন্ধ হয়ে যাচ্ছে, নিত্যপ্রয়োজনীয় জিনিসের দাম বাড়ছে, অথচ এত বিপুল অর্থ খরচ করে যুদ্ধবিমান কেনার প্রয়োজন কেন?
তাঁর বক্তব্যের সারকথা, বর্তমান পরিস্থিতিতে বাংলাদেশের অগ্রাধিকার হওয়া উচিত অর্থনীতি, বিদ্যুৎ, সার এবং সাধারণ মানুষের প্রয়োজন মেটানো।
চিনের সঙ্গে বাংলাদেশের প্রতিরক্ষা সম্পর্ক কতটা বাড়ছে?
বাংলাদেশের সঙ্গে চিনের প্রতিরক্ষা সম্পর্ক অবশ্য নতুন নয়। দীর্ঘদিন ধরেই বাংলাদেশি সশস্ত্র বাহিনীর একটি বড় অংশ চিনা অস্ত্র ও সরঞ্জামের উপর নির্ভরশীল। বাংলাদেশ চিনা যুদ্ধবিমান, নৌযান, সাঁজোয়া যান এবং সাবমেরিনও ব্যবহার করে।
সাম্প্রতিক বছরগুলিতে এই সম্পর্ক আরও বিস্তৃত হয়েছে। চিনা J-10CE যুদ্ধবিমান কেনার সম্ভাবনা বাস্তবায়িত হলে বাংলাদেশের বিমানবাহিনীতে তা একটি বড় আধুনিকীকরণ হিসেবে দেখা হবে। একই সঙ্গে ভারতীয় নিরাপত্তা মহলেও বিষয়টি নজরে রয়েছে, কারণ বাংলাদেশের উত্তরাঞ্চলীয় এলাকাগুলি ভারতের কৌশলগত গুরুত্বপূর্ণ শিলিগুড়ি করিডরের কাছাকাছি।
তবে যুদ্ধবিমান কেনার চূড়ান্ত চুক্তি ও সরবরাহের বিষয়ে প্রকাশ্যে আসা তথ্যের মধ্যে কিছু পার্থক্য রয়েছে। তাই নির্দিষ্ট সংখ্যা বা চুক্তির অঙ্ককে চূড়ান্ত বলে ধরে নেওয়ার আগে সরকারি ঘোষণা দেখা গুরুত্বপূর্ণ।
ভারতের সঙ্গে তিস্তা নিয়ে হাসিনার অবস্থান কী ছিল?
হাসিনা জানিয়েছেন, তাঁর সরকারের সময়ে ভারত ও বাংলাদেশের মধ্যে তিস্তা প্রকল্প নিয়ে আলোচনা হয়েছিল এবং ভারতীয় সহযোগিতায় প্রকল্পটি এগিয়ে নেওয়ার বিষয়ে কথাবার্তা হয়েছিল। ২০২৪ সালে তাঁর ভারত সফরের সময়ও তিস্তা নিয়ে সহযোগিতার বিষয়টি আলোচনায় এসেছিল।
তাঁর সরকারের সময় ভারত তিস্তা প্রকল্পের বিষয়ে প্রযুক্তিগত সহায়তা ও মূল্যায়নের আগ্রহ দেখিয়েছিল। পরে বাংলাদেশে রাজনৈতিক পরিবর্তনের পর চিন এই প্রকল্পে আরও সক্রিয় হয়ে ওঠে।
দেশে ফেরার ঘোষণা কেন গুরুত্বপূর্ণ?
২০২৪ সালের ৫ আগস্ট ক্ষমতাচ্যুত হওয়ার পর থেকে ভারতে রয়েছেন শেখ হাসিনা। তাঁর বিরুদ্ধে বাংলাদেশে একাধিক মামলা রয়েছে এবং বাংলাদেশ সরকার তাঁর প্রত্যর্পণের দাবিও জানিয়েছে। অন্যদিকে হাসিনা তাঁর বিরুদ্ধে দায়ের হওয়া বহু মামলাকে রাজনৈতিক প্রতিহিংসার ফল বলে দাবি করেছেন।
সাম্প্রতিক সাক্ষাৎকারে তিনি স্পষ্ট করেছেন, তাঁর দেশে ফেরার সিদ্ধান্ত ক্ষমতায় ফেরার জন্য নয়, মানুষের পাশে দাঁড়ানোর জন্য। তিনি ডিসেম্বরের মধ্যে ফেরার ইচ্ছার কথা জানালেও নিরাপত্তা পরিস্থিতি এবং অন্যান্য বিষয় বিবেচনা করে নির্দিষ্ট সময় পরে ঘোষণা করবেন বলে জানিয়েছেন।
বাংলাদেশের ভবিষ্যৎ নিয়ে বড় বার্তা
চিনের সঙ্গে ঘনিষ্ঠতা, প্রতিরক্ষা খাতে বড় ব্যয় এবং তিস্তা প্রকল্পে বেজিংয়ের ভূমিকা—এই তিনটি বিষয়কে একসঙ্গে দেখছেন শেখ হাসিনা। তাঁর বক্তব্যে স্পষ্ট, বর্তমান বাংলাদেশের বিদেশনীতি ও নিরাপত্তা নীতির গতিপথ নিয়ে তিনি যথেষ্ট উদ্বিগ্ন।
অন্যদিকে ঢাকার দিক থেকে চিনের সঙ্গে সম্পর্ককে শুধুমাত্র সামরিক সহযোগিতা হিসেবে দেখলে পুরো ছবিটা ধরা পড়বে না। তিস্তা, বন্দর, বিনিয়োগ, শিল্পাঞ্চল এবং প্রযুক্তি—বিভিন্ন ক্ষেত্রেই চিনের সঙ্গে বাংলাদেশের যোগাযোগ বাড়ছে।
ফলে হাসিনার এই মন্তব্য শুধু বাংলাদেশের অভ্যন্তরীণ রাজনীতির বিষয় নয়। তিস্তা থেকে প্রতিরক্ষা—ঢাকা-বেজিং সম্পর্কের পরিবর্তন ভারতের উত্তর-পূর্বাঞ্চল ও পূর্ব সীমান্তের কৌশলগত হিসাবেও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠছে।
Keep reading
More in আন্তর্জাতিক

আন্তর্জাতিক
ধ্বংসলীলার গর্ভ থেকে ৬ দিনে ১০০ উদ্ধার! চিনে নিন নেপালের প্রথম মহিলা হেলিকপ্টার ক্যাপ্টেন প্রিয়া অধিকারীকে
নেপালের ভয়াবহ বন্যা ও ভূমিধসে যখন একের পর এক জনপদ কার্যত বিচ্ছিন্ন, তখন আকাশপথে উদ্ধার অভিযানে নজির গড়েছেন প্রিয়া অধিকারী। নেপালের প্রথম মহ…
আন্তর্জাতিক
মৃত্যুপুরী নেপালের ধ্বংসস্তূপে ‘দেবশিশু’! প্রায় ৭ দিন পর অলৌকিক উদ্ধার ৪৫ দিনের ফুটফুটে এক শিশু
নেপালের ভয়াবহ বন্যা ও ধসের ধ্বংসস্তূপ থেকে উদ্ধার হল মাত্র ৪৫ দিনের এক শিশু। রসুয়া জেলার বিপর্যস্ত এলাকায় প্রায় এক সপ্তাহ ধরে আটকে থাকার পর…
আন্তর্জাতিক
নেপাল-বিপর্যয় নিয়ে বিরাট মন্তব্য সদগুরুর! ‘হিমালয় আপনাদের রাজনীতি ও ভাষা বোঝে না’, এখনই এই ৫ দেশ মিলে তৈরি করুক বোর্ড
নেপাল-তিব্বত সীমান্তের ভয়াবহ বন্যা ও ধসের পর হিমালয় নিয়ে বড় প্রস্তাব দিলেন সদগুরু জগ্গী বাসুদেব। কাঠমান্ডুর এক সংহতি অনুষ্ঠানে তিনি ভারত, চ…
আন্তর্জাতিক
‘দান নয়, ক্ষতিপূরণ চাই’! ভয়াবহ বিপর্যয়ের জন্য ভারত-সহ এই দেশগুলিকে দায়ী করল নেপাল
ভয়াবহ বন্যা ও হিমবাহজনিত বিপর্যয়ের পর এবার আন্তর্জাতিক মঞ্চে ক্ষতিপূরণের দাবি তুলল নেপাল। দেশটির বিদেশমন্ত্রী শিশির খানাল বলেছেন, এই অর্থ কো…
আন্তর্জাতিক
ভুলেও ধরবেন না, খাবেন না! নেপালের বন্যায় ভেসে আসা মাছ নিয়ে বড় সতর্কতা, সরকারি নির্দেশ জারি
নেপালের ভয়াবহ বন্যার জল গড়িয়ে বিহারের গণ্ডক অববাহিকায় পৌঁছতেই দেখা মিলছে অচেনা ও অস্বাভাবিক দেখতে কিছু মাছের। বিষয়টি নিয়ে পশ্চিম চম্পারণ ও…
আন্তর্জাতিক
নেপালে ভয়াবহ বন্যা: মৃতের সংখ্যা ১০০০ ছাড়াল, নিখোঁজ ৪ হাজার
ভয়াবহ বন্যা ও ভূমিধসে বিপর্যস্ত নেপাল। সপ্তম দিনেও জোরকদমে চলছে উদ্ধার ও তল্লাশি অভিযান। মৃতের সংখ্যা ১০০০ ছাড়িয়েছে এবং প্রায় ৪ হাজার মানুষ…
