রাজনীতি

তিন মাস বিরোধী আসনে তৃণমূল: ভাঙনের ধাক্কায় মমতার সামনে বড় পরীক্ষা

২০২৬ সালের বিধানসভা নির্বাচনে ক্ষমতা হারানোর পর মাত্র তিন মাসের মধ্যেই গভীর সাংগঠনিক সংকটে তৃণমূল কংগ্রেস। বিধানসভা ও সাংসদদের একাংশের বিদ্রোহ, নেতৃত্ব নিয়ে প্রশ্ন এবং দলীয় প্রতীক ও সংগঠনের নিয়ন্ত্রণ নিয়ে সংঘাত—সব মিলিয়ে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের সামনে এখন সবচেয়ে কঠিন রাজনৈতিক পরীক্ষা। প্রশ্ন একটাই: তৃণমূল কি নতুন করে ঘুরে দাঁড়াবে, নাকি ভাঙনই হয়ে উঠবে দলের ভবিষ্যতের নির্ধারক?

Share
তিন মাস বিরোধী আসনে তৃণমূল: ভাঙনের ধাক্কায় মমতার সামনে বড় পরীক্ষা

তিন মাস বিরোধী আসনে তৃণমূল: ভাঙনের ধাক্কায় মমতার সামনে টিকে থাকা, পুনর্গঠন নাকি অস্তিত্ব সংকট

পশ্চিমবঙ্গের রাজনীতিতে দীর্ঘ ১৫ বছরের শাসনের অবসানের পর মাত্র তিন মাসের মধ্যেই গভীর সাংগঠনিক সংকটে তৃণমূল কংগ্রেস। ২০২৬ সালের বিধানসভা নির্বাচনে বিজেপির কাছে পরাজয়ের পর যে অস্বস্তি দলের অন্দরে শুরু হয়েছিল, তা দ্রুত প্রকাশ্য বিদ্রোহে পরিণত হয়েছে। এখন আর প্রশ্ন শুধু নির্বাচনী পরাজয় সামলানোর নয়; প্রশ্ন তৃণমূল কংগ্রেস আদৌ আগের কাঠামো ও নেতৃত্বের অধীনে টিকে থাকবে কি না।

জুনের শুরুতেই তৃণমূলের বিধায়ক দলের বড় অংশ মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের নেতৃত্বাধীন কাঠামোর বিরুদ্ধে অবস্থান নেয়। বিদ্রোহী শিবিরের নেতা হিসেবে উঠে আসেন ঋতব্রত বন্দ্যোপাধ্যায়। ৮০ জন তৃণমূল বিধায়কের মধ্যে প্রথম পর্যায়ে ৫৮ জন তাঁর নেতৃত্বকে সমর্থন করেন বলে দাবি করা হয়। পরবর্তী সময়ে সেই সংখ্যা আরও বাড়ার দাবি সামনে আসে।

এই বিদ্রোহের কেন্দ্রবিন্দুতে ছিল শুধু মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের নেতৃত্ব নয়, বরং দলের সাধারণ সম্পাদক অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়ের ভূমিকা নিয়েও অসন্তোষ। একাধিক বিদ্রোহী নেতা প্রকাশ্যে মমতার বিরুদ্ধে না গিয়ে অভিষেকের সাংগঠনিক প্রভাব ও সিদ্ধান্ত গ্রহণের পদ্ধতিকে নিশানা করেছেন। ফলে তৃণমূলের অভ্যন্তরীণ সংঘাত ক্রমশ নেতৃত্বের ভবিষ্যৎ নিয়েও প্রশ্ন তুলেছে।

বিধানসভা থেকে জাতীয় সংগঠন—ভাঙনের প্রভাব সর্বত্র

তৃণমূলের সংকট শুধু বিধানসভাতেই সীমাবদ্ধ থাকেনি। জুন মাসে বিদ্রোহী শিবির লোকসভায় দলের ২৮ জন সাংসদের মধ্যে ২০ জনের সমর্থন থাকার দাবি করে এবং বিজেপি নেতৃত্বাধীন এনডিএকে সমর্থনের পথে এগোয়। একই সময়ে রাজ্যসভাতেও দলের দুই সদস্যের পদত্যাগের ঘটনা সামনে আসে।

এই পরিস্থিতি তৃণমূলের সাংগঠনিক ভিত্তির জন্য অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ। কারণ, নির্বাচনী পরাজয়ের পরে সাধারণত কোনও দলকে ঘুরে দাঁড়াতে সময় দেওয়া হয়। কিন্তু তৃণমূলের ক্ষেত্রে নেতৃত্বের দ্বন্দ্ব এবং সাংগঠনিক ভাঙন এত দ্রুত প্রকাশ্যে এসেছে যে দলের পুনর্গঠনের সুযোগও সংকুচিত হয়েছে।

মমতার সামনে তিনটি রাস্তা

এই পরিস্থিতিতে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের সামনে কার্যত তিনটি পথ।

প্রথমত, বিদ্রোহ দমন করে পুরনো সাংগঠনিক কাঠামোকে ধরে রাখা। কিন্তু এত সংখ্যক বিধায়ক ও নেতার প্রকাশ্য বিরোধিতার পরে এই পথ কতটা বাস্তবসম্মত, তা নিয়ে প্রশ্ন রয়েছে।

দ্বিতীয়ত, পুরনো নেতৃত্ব ও সাংগঠনিক পদ্ধতিতে বড়সড় পরিবর্তন এনে তৃণমূলকে নতুন করে সাজানো। মমতা ইতিমধ্যেই পুরনো নেতা ও বিশ্বস্তদের সামনে এনে সংগঠন পুনর্গঠনের চেষ্টা করেছেন।

তৃতীয়ত, তৃণমূলের ভাঙনকে মেনে নিয়ে মমতার নেতৃত্বাধীন একটি পৃথক রাজনৈতিক কাঠামো তৈরি করা। কিন্তু সেই ক্ষেত্রে দলের নাম, প্রতীক, সংগঠন এবং সম্পদের নিয়ন্ত্রণ নিয়ে আইনি ও রাজনৈতিক লড়াই আরও তীব্র হতে পারে।

দলীয় প্রতীক ও সাংগঠনিক নিয়ন্ত্রণ নিয়ে দুই পক্ষের দাবি ইতিমধ্যেই নির্বাচন কমিশনের দরজায় পৌঁছেছে। মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের শিবির এবং ঋতব্রত বন্দ্যোপাধ্যায়ের নেতৃত্বাধীন বিদ্রোহী শিবির পৃথক জাতীয় কর্মসমিতির তালিকা জমা দিয়েছে বলে প্রতিবেদন প্রকাশিত হয়েছে। নির্বাচন কমিশনও দুই পক্ষের বক্তব্য চেয়েছে।

বাংলার বিরোধী রাজনীতিতে নতুন সমীকরণ

তৃণমূলের দুর্বলতা শুধু দলের অভ্যন্তরীণ বিষয় নয়। এর সরাসরি প্রভাব পড়তে পারে পশ্চিমবঙ্গের বিরোধী রাজনীতিতে।

একদিকে বিজেপি রাজ্যে ক্ষমতায় এসে তৃণমূলের সাংগঠনিক দুর্বলতার সুযোগ নিতে চাইছে। অন্যদিকে দীর্ঘদিন তৃণমূলের ছায়ায় থাকা বাম ও কংগ্রেসও নিজেদের রাজনৈতিক জায়গা পুনরুদ্ধারের সম্ভাবনা দেখছে।

বাংলার রাজনৈতিক ইতিহাসে ক্ষমতা হারানোর পর কোনও দলের দ্রুত পতন নতুন ঘটনা নয়। ৩৪ বছর ক্ষমতায় থাকা বামফ্রন্ট ২০১১ সালের পর ক্রমশ দুর্বল হয়েছে এবং ২০২৬ সালের বিধানসভা নির্বাচনে তাদের উপস্থিতি প্রায় নিশ্চিহ্ন হওয়ার পর্যায়ে পৌঁছেছে। তৃণমূলের বর্তমান পরিস্থিতি সেই ইতিহাসের সঙ্গে তুলনা টানার সুযোগ তৈরি করেছে, যদিও তৃণমূলের ক্ষেত্রে দলের অভ্যন্তরীণ নেতৃত্বের দ্বন্দ্বই এখন সবচেয়ে বড় পার্থক্য।

মমতার ব্যক্তিগত রাজনৈতিক ওজনই বড় ভরসা

তবে তৃণমূলের সংকট যত গভীরই হোক, মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের ব্যক্তিগত রাজনৈতিক প্রভাবকে উপেক্ষা করা যাবে না। তিনিই তৃণমূলকে তৈরি করেছেন এবং দীর্ঘ সময় ধরে বাংলার রাজনীতির অন্যতম প্রধান মুখ হিসেবে দলকে পরিচালনা করেছেন।

তাই তৃণমূলের ভবিষ্যৎ নির্ধারণে শুধু বিধায়ক বা সাংসদের সংখ্যা নয়, মমতা কত দ্রুত সংগঠনের সঙ্গে যোগাযোগ পুনর্গঠন করতে পারেন, নিচুতলার কর্মীদের ধরে রাখতে পারেন এবং নতুন রাজনৈতিক বয়ান তৈরি করতে পারেন—সেটিও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠবে।

সামনে কঠিন লড়াই

তিন মাস বিরোধী আসনে বসতেই তৃণমূলের যে অভ্যন্তরীণ সংকট প্রকাশ্যে এসেছে, তা নিছক নেতৃত্বের দ্বন্দ্ব হিসেবে দেখলে ভুল হবে। এটি দলের সংগঠন, উত্তরাধিকার, নেতৃত্ব এবং রাজনৈতিক ভবিষ্যৎ—সবকিছুকে ঘিরে তৈরি হওয়া একটি বহুমাত্রিক সংকট।

মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের সামনে এখন শুধু বিজেপিকে মোকাবিলা করার প্রশ্ন নেই। নিজের দলের ভাঙন সামলে তৃণমূলকে নতুন রাজনৈতিক পরিচয় দেওয়াই তাঁর সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ।

শেষ পর্যন্ত তৃণমূল টিকে থাকবে কি না, তা নির্ভর করবে মমতার নেতৃত্ব কতটা দ্রুত নতুন বাস্তবতার সঙ্গে মানিয়ে নিতে পারে তার উপর। দল যদি পুনর্গঠনের পথে সফল হয়, তবে এই সংকটই হয়তো ভবিষ্যতের ঘুরে দাঁড়ানোর ভিত্তি হয়ে উঠতে পারে। আর যদি ভাঙন আরও গভীর হয়, তবে বাংলার রাজনীতিতে তৃণমূলের দীর্ঘদিনের আধিপত্যের অবসান আরও দ্রুত ঘটতে পারে।

Enjoyed this story? Share it.

Share

Keep reading

More in রাজনীতি

সব দেখুন
স্টোল থেকে একই মঞ্চে: রাজনৈতিক টানাপোড়েন পেরিয়েও মমতা-সোনিয়ার সম্পর্ক

রাজনীতি

স্টোল থেকে একই মঞ্চে: রাজনৈতিক টানাপোড়েন পেরিয়েও মমতা-সোনিয়ার সম্পর্ক

দিল্লিতে INDIA ব্লকের সাম্প্রতিক বৈঠকে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় ও সোনিয়া গান্ধীর উষ্ণ মুহূর্ত ফের নজর কেড়েছে। মমতা সোনিয়াকে পশ্চিমবঙ্গ থেকে আনা…

2 min read
Gyanesh Kumar ও SIR ইস্যুতে ৪ অক্টোবর মুম্বইয়ে প্রতিবাদ মিছিল, যোগ দেবে NCP-SP ও কংগ্রেস

রাজনীতি

Gyanesh Kumar ও SIR ইস্যুতে ৪ অক্টোবর মুম্বইয়ে প্রতিবাদ মিছিল, যোগ দেবে NCP-SP ও কংগ্রেস

মুখ্য নির্বাচন কমিশনার জ্ঞানেশ কুমার এবং ভোটার তালিকার Special Intensive Revision (SIR)-কে ঘিরে বিতর্কের মধ্যে ৪ অক্টোবর মুম্বইয়ে প্রস্তাবিত…

2 min read
কর্ণাটকে SIR নিয়ে নতুন বিতর্ক, Form 7-এ ভোটার বাদ দেওয়ার তথ্য চাইলেন শিবকুমার

রাজনীতি

কর্ণাটকে SIR নিয়ে নতুন বিতর্ক, Form 7-এ ভোটার বাদ দেওয়ার তথ্য চাইলেন শিবকুমার

কর্ণাটকে চলা Special Intensive Revision (SIR) নিয়ে বিতর্কের মধ্যেই মুখ্যমন্ত্রী ডি কে শিবকুমার Form 7-এর মাধ্যমে ভোটারদের নাম বাদ দেওয়ার আবে…

3 min read
‘ইস্তফা জনতা পার্টি’ কটাক্ষ রামদাস আঠাওয়ালের, CEC জ্ঞানেশ কুমারের পদত্যাগের দাবি ঘিরে বিতর্ক

রাজনীতি

‘ইস্তফা জনতা পার্টি’ কটাক্ষ রামদাস আঠাওয়ালের, CEC জ্ঞানেশ কুমারের পদত্যাগের দাবি ঘিরে বিতর্ক

CEC জ্ঞানেশ কুমারের পদত্যাগের দাবিকে কেন্দ্র করে রাজনৈতিক চাপানউতোরের মধ্যে CJP-কে ‘ইস্তফা জনতা পার্টি’ বলে কটাক্ষ করেছেন কেন্দ্রীয় মন্ত্রী…

2 min read
SIR বিতর্কে কংগ্রেসের ৫ দাবি, প্রধানমন্ত্রী ও CEC-এর পদত্যাগ চাইল দল

রাজনীতি

SIR বিতর্কে কংগ্রেসের ৫ দাবি, প্রধানমন্ত্রী ও CEC-এর পদত্যাগ চাইল দল

নির্বাচন কমিশনের Special Intensive Revision বা SIR ঘিরে চলা বিতর্কের মধ্যে মঙ্গলবার কংগ্রেস ওয়ার্কিং কমিটি একাধিক দাবি তুলেছে। দলের পক্ষ থেক…

3 min read
রেভন্থ রেড্ডির ‘ধনী-গরিবের ঈশ্বর’ মন্তব্যে বিতর্ক, তীব্র আক্রমণ BJP-র

রাজনীতি

রেভন্থ রেড্ডির ‘ধনী-গরিবের ঈশ্বর’ মন্তব্যে বিতর্ক, তীব্র আক্রমণ BJP-র

তেলঙ্গানার মুখ্যমন্ত্রী এ রেভন্থ রেড্ডি ভগবান রামকে ‘ধনীদের ঈশ্বর’ এবং ভগবান শিবকে ‘গরিবদের ঈশ্বর’ হিসেবে উল্লেখ করায় রাজনৈতিক বিতর্ক শুরু হ…

2 min read