আবাসের টাকা নয়ছয়! রাজ্যের রিপোর্টে চরম ক্ষুব্ধ হাইকোর্ট, দিল বড় নির্দেশ
প্রধানমন্ত্রী গ্রামীণ আবাস যোজনার টাকা নয়ছয়ের অভিযোগে রাজ্যের রিপোর্টে অসন্তোষ প্রকাশ করল কলকাতা হাইকোর্ট। অভিযোগ ছিল, প্রকৃত উপভোক্তাদের বাড়ি তৈরির টাকা অন্য খাতে বা অন্য ব্যক্তিদের সুবিধা দিতে ব্যবহার করা হয়েছে। মামলায় রাজ্যকে তদন্ত করে রিপোর্ট জমা দেওয়ার নির্দেশ দিয়েছিল আদালত। পরবর্তী শুনানিতে অনিয়মের বিষয়টি সামনে আসার পর সংশ্লিষ্ট আধিকারিকদের বিরুদ্ধে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপের নির্দেশ দেওয়া হয়।
লিখেছেন
Priya Jana
কলকাতা: গরিব মানুষের মাথার উপর পাকা ছাদ তৈরির জন্য বরাদ্দ আবাস যোজনার টাকা নয়ছয়ের অভিযোগ নিয়ে ফের সরব কলকাতা হাইকোর্ট। সরকারি প্রকল্পের অর্থ নিয়ে অনিয়মের অভিযোগের তদন্তে রাজ্যের দেওয়া রিপোর্ট ঘিরে অসন্তোষ প্রকাশ করেছে আদালত। শুধু রিপোর্ট জমা দিয়েই দায় সারলে চলবে না, অভিযোগের সত্যতা থাকলে সংশ্লিষ্টদের বিরুদ্ধে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নিতে হবে—এমনই নির্দেশ দিয়েছে আদালত।
ঘটনার সূত্রপাত দক্ষিণ ২৪ পরগনার মগরাহাট-১ ব্লকের উত্তর কুসুম গ্রাম পঞ্চায়েতকে ঘিরে। অভিযোগ ওঠে, প্রধানমন্ত্রী গ্রামীণ আবাস যোজনার আওতায় গরিব মানুষের বাড়ি তৈরির জন্য বরাদ্দ অর্থে ব্যাপক অনিয়ম হয়েছে। ভুয়ো নথি ব্যবহার করে প্রকৃত উপভোক্তাদের বদলে অন্যদের সুবিধা পাইয়ে দেওয়ার অভিযোগও ওঠে। সেই অভিযোগের ভিত্তিতেই আদালতের দ্বারস্থ হন মামলাকারী।
কী নিয়ে আদালতে মামলা?
মামলাকারীর অভিযোগ ছিল, ২০১৩ থেকে ২০২৩ সাল পর্যন্ত উত্তর কুসুম গ্রাম পঞ্চায়েতের তৎকালীন প্রধানের আমলে আবাস যোজনার টাকা নয়ছয় করা হয়েছে। প্রকৃত দরিদ্রদের বাড়ি তৈরির বদলে ভুয়ো নথির মাধ্যমে সুবিধা পাইয়ে দেওয়া এবং সরকারি অর্থ আত্মসাতের অভিযোগ ওঠে।
মামলাকারীর আইনজীবীরা আদালতে বেশ কিছু নথিও তুলে ধরেন। তাঁদের দাবি, আবাস যোজনায় বাড়ি তৈরির পর নিয়ম মেনে উপভোক্তার বাড়ির ছবি জমা দেওয়ার কথা। কিন্তু সেই নথিতে এমন ছবি পাওয়া গিয়েছে, যা উপভোক্তার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়। একটি ক্ষেত্রে বয়স্ক এক মহিলার নামে থাকা নথিতে শিশুর ছবি ব্যবহারের অভিযোগও আদালতের নজরে আনা হয়।
একজনের নামে ২৯টি শৌচাগারের টাকা!
মামলায় আরও চাঞ্চল্যকর অভিযোগ ওঠে। নথি দেখিয়ে আইনজীবীরা দাবি করেন, সেরিনা বিবি নামে এক ব্যক্তির নামে ২৯টি শৌচাগার তৈরির টাকা দেওয়া হয়েছে।
এই ধরনের তথ্য সামনে আসতেই প্রকল্পের অর্থ বরাদ্দ ও ব্যবহার নিয়ে প্রশ্ন আরও জোরালো হয়। আদালতও অভিযোগগুলিকে গুরুত্ব দিয়ে রাজ্যের কাছে বিস্তারিত রিপোর্ট চায়।
৬ সপ্তাহের মধ্যে রিপোর্ট চেয়েছিল আদালত
মামলাটির শুনানিতে প্রধান বিচারপতি টিএস শিবজ্ঞানম ও বিচারপতি হিরণ্ময় ভট্টাচার্যের ডিভিশন বেঞ্চ রাজ্যকে বিষয়টি খতিয়ে দেখে ছয় সপ্তাহের মধ্যে রিপোর্ট জমা দেওয়ার নির্দেশ দিয়েছিল। সরকারি প্রকল্পের টাকা কীভাবে খরচ হয়েছে, অভিযোগের সত্যতা কতটা এবং অনিয়ম হয়ে থাকলে তার বিরুদ্ধে কী পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে—সবটাই রিপোর্টে জানাতে বলা হয়।
আদালতের এই অবস্থান থেকেই স্পষ্ট, আবাস যোজনার মতো সরাসরি সাধারণ মানুষের সঙ্গে যুক্ত সরকারি প্রকল্পে আর্থিক অনিয়মের অভিযোগকে হালকাভাবে দেখতে রাজি নয় হাইকোর্ট।
ক্যানিংয়ের মামলাতেও উঠে এসেছিল টাকা নয়ছয়ের অভিযোগ
আবাস যোজনার টাকা নিয়ে এর আগেও কলকাতা হাইকোর্টে গুরুতর অভিযোগ উঠেছিল। ক্যানিংয়ের ইটখোলা পঞ্চায়েতের হেড়োভাঙা গ্রামের পাঁচ বাসিন্দা অভিযোগ করেছিলেন, তাঁরা আবাস যোজনার জন্য আবেদন করলেও টাকা তাঁদের হাতে পৌঁছয়নি। বরং সেই অর্থ অন্য ব্যক্তিদের ব্যাঙ্ক অ্যাকাউন্টে চলে গিয়েছিল বলে অভিযোগ ওঠে।
তদন্তের পর রাজ্য সরকারও আদালতে স্বীকার করে যে অভিযোগের সত্যতা রয়েছে এবং পাঁচ আবেদনকারীর জন্য বরাদ্দ অর্থ অন্য অ্যাকাউন্টে গিয়েছিল।
এই মামলায় বিচারপতি রবি কিষাণ কপূর প্রশ্ন তোলেন, বিষয়টি জানার পরেও কেন ফৌজদারি মামলা করা হয়নি। আদালতের পর্যবেক্ষণ ছিল, একসঙ্গে পাঁচজনের ক্ষেত্রে একই ধরনের ভুল হওয়াকে নিছক প্রশাসনিক ভুল বলে এড়িয়ে যাওয়া যায় না।
আবাসের টাকা সরাসরি উপভোক্তার অ্যাকাউন্টে যাওয়ার কথা
প্রধানমন্ত্রী গ্রামীণ আবাস যোজনার সরকারি তথ্য অনুযায়ী, যোগ্য উপভোক্তাকে বাড়ি তৈরির জন্য আর্থিক সহায়তা দেওয়া হয় এবং অর্থ সরাসরি উপভোক্তার ব্যাঙ্ক অ্যাকাউন্টে জমা হওয়ার ব্যবস্থা রয়েছে। পশ্চিমবঙ্গের সরকারি তথ্য অনুযায়ী, বাড়ি নির্মাণের বিভিন্ন পর্যায়ে কিস্তিতে আর্থিক সহায়তা দেওয়ার বিধান রয়েছে।
ফলে প্রকল্পের টাকা অন্য ব্যক্তির অ্যাকাউন্টে চলে যাওয়া বা ভুয়ো নথির মাধ্যমে অর্থ বরাদ্দের অভিযোগ উঠলে বিষয়টি যে গুরুতর, তা আদালতের পর্যবেক্ষণেও স্পষ্ট।
বর্তমানে আবাস প্রকল্পে বড় অঙ্কের টাকা বরাদ্দ
এদিকে ২০২৬ সালে রাজ্যের আবাস প্রকল্পে বিপুল অর্থ বিতরণের খবরও সামনে এসেছে। ৭ অগস্টের এক সরকারি-উদ্ধৃত প্রতিবেদনে জানানো হয়, ১০ লক্ষ ২০ হাজার ৩৭৯ জন উপভোক্তার অ্যাকাউন্টে ৬,১২২.২৭ কোটি টাকা DBT-এর মাধ্যমে পাঠানো হয়েছে। ওই সময়ে রাজ্যজুড়ে ‘আবাস প্লাস’ সমীক্ষার কাজও চলছিল।
অর্থাৎ, একদিকে বিপুল সংখ্যক প্রকৃত উপভোক্তার কাছে অর্থ পৌঁছে দেওয়ার উদ্যোগ চলছে, অন্যদিকে অতীতে প্রকল্পের অর্থ নিয়ে ওঠা অনিয়মের অভিযোগগুলির তদন্তও আদালতের নজরে রয়েছে।
আদালতের নজরে সরকারি প্রকল্পের টাকা
আবাস যোজনার টাকা মূলত গরিব মানুষের বাড়ি তৈরির জন্য। ফলে সেই অর্থে অনিয়ম হলে তার সরাসরি প্রভাব পড়ে প্রকৃত উপভোক্তাদের উপর। সেই কারণেই অভিযোগের সত্যতা যাচাই করে দায়ীদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার উপর জোর দিচ্ছে আদালত।
তবে কোনও নির্দিষ্ট ব্যক্তি বা আধিকারিক দোষী সাব্যস্ত হয়েছেন—এমন দাবি করা এই পর্যায়ে ঠিক হবে না। আদালতে ওঠা অভিযোগ, তদন্তের ফল এবং পরবর্তী বিচারিক সিদ্ধান্ত—এই তিনটি বিষয় আলাদা করে দেখা জরুরি।
আবাস যোজনার টাকা নিয়ে একের পর এক অভিযোগের পর এখন নজর থাকবে তদন্তের পরবর্তী পদক্ষেপ এবং আদালতে জমা পড়া রিপোর্টের উপর। প্রকৃত উপভোক্তার টাকা যদি নয়ছয় হয়ে থাকে, তাহলে সেই অর্থ উদ্ধার এবং দায়ীদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা—দুই বিষয়েই আদালতের অবস্থান গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে।
Keep reading
More in জাতীয়
জাতীয়
বিহার-ঝাড়খণ্ডের ২৫ বছরের জলবিবাদ মিটল, সোন নদীর নতুন চুক্তিতে কী বদলাবে?
প্রায় ২৫ বছর ধরে চলা সোন নদীর জলবণ্টন বিবাদের অবসান ঘটাল বিহার ও ঝাড়খণ্ড। ৩১ আগস্ট ২০২৬ নয়াদিল্লিতে দুই রাজ্যের মধ্যে একটি Memorandum of Un…
জাতীয়
তামিলনাড়ুতে সেমিকন্ডাক্টর পার্ক, ফিনটেক ও লজিস্টিক্স হাব, ৫ হাজার কর্মসংস্থানের সম্ভাবনা
তামিলনাড়ুতে শিল্প ও প্রযুক্তি ক্ষেত্রে বড়সড় পরিকাঠামোগত উদ্যোগের ঘোষণা। কাঞ্চিপুরমে ১৭৫ কোটি টাকা ব্যয়ে সেমিকন্ডাক্টর ও ইলেকট্রনিক্স ম্য…
জাতীয়
অসমে দুধ উৎপাদন বাড়াতে বড় উদ্যোগ, ডেয়ারি খাত পর্যালোচনায় মুখ্যমন্ত্রী হিমন্ত বিশ্ব শর্মা
অসমের ডেয়ারি খাতকে আরও শক্তিশালী করতে পাঁচ বছরের রোডম্যাপ তৈরির নির্দেশ দিয়েছেন মুখ্যমন্ত্রী হিমন্ত বিশ্ব শর্মা। দুধ উৎপাদন বৃদ্ধি, ডেয়ারি স…
জাতীয়
দিল্লির ভোটার তালিকা নিয়ে কেজরিওয়ালের বিস্ফোরক দাবি, ‘১৪০ কোটি থেকে ৫০ কোটি হয়ে যাবে’
দিল্লির Special Intensive Revision বা SIR-এর পর প্রকাশিত খসড়া ভোটার তালিকায় প্রায় ৪৭.৭ লক্ষ ভোটারের নাম না থাকাকে কেন্দ্র করে রাজনৈতিক চাপা…
জাতীয়
নেশামুক্ত ভারত গড়ার অভিযানে যুবসমাজ, বড় বার্তা প্রধানমন্ত্রী মোদীর
নেশার বিরুদ্ধে দেশজুড়ে সচেতনতা তৈরির লক্ষ্যে ‘নেশামুক্ত যুব ফর বিকশিত ভারত’ অভিযান গতি পাচ্ছে বলে জানালেন প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী। তাঁর…
জাতীয়
India Debt: ২০৩০ সালের মধ্যে GDP-র ৫০% ঋণ কমানোর পথে ভারত, জানালেন নির্মলা সীতারমণ
ভারতের সরকারি ঋণ-জিডিপি অনুপাত ২০৩০ সালের মধ্যে প্রায় ৫০ শতাংশে নামিয়ে আনার লক্ষ্যে সরকার এগোচ্ছে বলে জানিয়েছেন কেন্দ্রীয় অর্থমন্ত্রী নির্মল…
