প্রবল বৃষ্টি ও বাঁধের জলে বন্যা! নদীর তলায় গোটা এলাকা, ক্লাসরুমে সাপ, যাতায়াতে নৌকাই ভরসা
প্রবল বৃষ্টি ও বাঁধের জল ছাড়ার জেরে ভয়াবহ বন্যা পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে। বিস্তীর্ণ এলাকা জলের তলায় চলে যাওয়ায় ঘরবাড়ি থেকে স্কুল—সবকিছুতেই ঢুকে পড়েছে জল। এমনকি ক্লাসরুমেও সাপ দেখা যাওয়ায় আতঙ্ক ছড়িয়েছে পড়ুয়া ও শিক্ষকদের মধ্যে। বহু জায়গায় সড়ক যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ায় নৌকাই এখন যাতায়াতের একমাত্র ভরসা।
লিখেছেন
Priya Jana
কলকাতা: টানা প্রবল বৃষ্টি, তার সঙ্গে বাঁধের জল। দুইয়ের জেরে কার্যত জলের তলায় চলে গিয়েছে বিস্তীর্ণ এলাকা। কোথাও বাড়ির উঠোনে কোমরসমান জল, কোথাও রাস্তা বলে আর কিছুই বোঝার উপায় নেই। স্কুলের মাঠ পেরিয়ে জল ঢুকে পড়েছে ক্লাসরুমেও। পরিস্থিতি এমন ভয়াবহ যে ক্লাসরুমের ভিতরে সাপ দেখা দিয়েছে বলে আতঙ্ক ছড়িয়েছে।
বন্যার জলে বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়েছে একাধিক জনপদ। স্থানীয় বাসিন্দাদের অভিযোগ, জল বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে দৈনন্দিন জীবন কার্যত থমকে গিয়েছে। বাজার, স্কুল, স্বাস্থ্যকেন্দ্র—সব জায়গায় পৌঁছনোই কঠিন হয়ে উঠেছে। কোথাও কোথাও রাস্তার উপর দিয়ে স্রোত বইছে। ফলে সাধারণ যানবাহন চলাচল বন্ধ।
নদীর তলায় গোটা এলাকা
প্রবল বৃষ্টির পর বাঁধ থেকে জল ছাড়ার কারণে নদী ও খালগুলিতে জলস্তর দ্রুত বেড়েছে। সেই জল উপচে ঢুকে পড়েছে সংলগ্ন গ্রাম ও জনপদে। কয়েক ঘণ্টার মধ্যেই বহু এলাকা প্লাবিত হয়ে পড়ে।
স্থানীয়দের দাবি, বাড়ির নীচতলা, রাস্তা, চাষের জমি—সবই এখন জলের তলায়। অনেক পরিবার বাধ্য হয়ে ঘরের উঁচু জায়গায় আশ্রয় নিয়েছে। যাঁদের বাড়িতে জল ঢুকে পড়েছে, তাঁদের কেউ কেউ আত্মীয়ের বাড়ি বা ত্রাণশিবিরে চলে যাচ্ছেন।
ক্লাসরুমে জল, আতঙ্ক সাপ নিয়ে
বন্যার সবচেয়ে ভয়াবহ প্রভাব পড়েছে স্কুলগুলিতেও। স্কুল চত্বরে জল ঢোকার পাশাপাশি কয়েকটি শ্রেণিকক্ষেও জল ঢুকে পড়েছে। ফলে পঠনপাঠন কার্যত বন্ধ হওয়ার পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে।
জল বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে সাপ ও অন্যান্য জলজ প্রাণী লোকালয়ে ঢুকে পড়ার আশঙ্কাও বেড়েছে। একটি ক্লাসরুমে সাপ দেখা যাওয়ার ঘটনায় পড়ুয়া, শিক্ষক এবং অভিভাবকদের মধ্যে আতঙ্ক ছড়িয়েছে।
বন্যার সময় জলমগ্ন জায়গায় হাঁটাচলা না করার পরামর্শ দিচ্ছেন স্থানীয় প্রশাসন ও বিপর্যয় মোকাবিলা কর্মীরা। কারণ জলের নীচে রাস্তার গর্ত, নালা বা বিদ্যুতের তার রয়েছে কি না, বাইরে থেকে বোঝা সম্ভব নয়।
যাতায়াতে নৌকাই একমাত্র ভরসা
জলের তোড়ে বহু রাস্তা কার্যত অচল। কোথাও রাস্তার উপর দিয়ে স্রোত বইছে, কোথাও আবার রাস্তা সম্পূর্ণ ডুবে গিয়েছে। ফলে মোটরবাইক, অটো কিংবা চারচাকার গাড়ি নিয়ে বেরনোও ঝুঁকিপূর্ণ।
এই পরিস্থিতিতে নৌকাই হয়ে উঠেছে যোগাযোগের প্রধান মাধ্যম। স্থানীয় বাসিন্দারা নৌকায় করে প্রয়োজনীয় জিনিসপত্র আনছেন। অসুস্থ মানুষকে হাসপাতালে নিয়ে যাওয়া কিংবা জরুরি কাজে বাইরে যাওয়ার ক্ষেত্রেও নৌকার উপর নির্ভর করতে হচ্ছে।
সবচেয়ে বেশি সমস্যায় পড়েছেন বয়স্ক মানুষ, শিশু এবং অসুস্থরা।
জলের মধ্যে দিন কাটছে সাধারণ মানুষের
বন্যার জল শুধু যোগাযোগ ব্যবস্থাকেই বিপর্যস্ত করেনি, নষ্ট করেছে বহু পরিবারের ঘরবাড়ি ও রসদ। রান্নার জ্বালানি থেকে খাবার—সবকিছু নিয়েই সমস্যায় পড়েছেন দুর্গতরা।
বাড়িতে জল ঢুকে যাওয়ায় অনেকেই উঁচু জায়গায় জিনিসপত্র তুলে রেখেছেন। কেউ কেউ আবার পরিবারের সদস্যদের নিয়ে নিরাপদ জায়গায় চলে গিয়েছেন।
বিশুদ্ধ পানীয় জল এবং শুকনো খাবারের চাহিদাও বেড়েছে। প্রশাসনের পাশাপাশি স্থানীয় স্বেচ্ছাসেবী সংগঠন ও বাসিন্দারাও দুর্গতদের পাশে দাঁড়ানোর চেষ্টা করছেন।
নতুন করে বৃষ্টির আশঙ্কা বাড়াচ্ছে উদ্বেগ
বন্যা পরিস্থিতির মধ্যে ফের ভারী বৃষ্টি হলে জলস্তর আরও বাড়তে পারে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে। ফলে নদী ও বাঁধ সংলগ্ন এলাকার বাসিন্দাদের সতর্ক থাকতে বলা হয়েছে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, জল কমতে শুরু করলেও তৎক্ষণাৎ স্বাভাবিক পরিস্থিতি ফিরবে না। জল নামার পরও জলবাহিত রোগ, সাপের উপদ্রব এবং পানীয় জলের সংকট বড় সমস্যা হয়ে উঠতে পারে।
প্রশাসনের তরফে পরিস্থিতির উপর নজর রাখা হচ্ছে। প্রয়োজন হলে দুর্গত মানুষকে নিরাপদ জায়গায় সরিয়ে নেওয়ার ব্যবস্থাও করা হচ্ছে।
স্কুল খুলবে কবে?
জলমগ্ন স্কুলগুলিতে পঠনপাঠন কবে থেকে স্বাভাবিক হবে, তা পরিস্থিতির উপর নির্ভর করছে। স্কুল চত্বর ও ক্লাসরুম থেকে জল না নামা পর্যন্ত পড়ুয়াদের নিরাপত্তার কথা মাথায় রেখে ক্লাস বন্ধ রাখার সিদ্ধান্তই নিরাপদ বলে মনে করছেন স্থানীয়রা।
এখন সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হল জলমগ্ন এলাকা থেকে মানুষকে নিরাপদে সরিয়ে নেওয়া এবং দ্রুত ত্রাণ ও পানীয় জল পৌঁছে দেওয়া।
প্রবল বৃষ্টি ও বাঁধের জলের জেরে যে পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে, তাতে একটা বিষয় স্পষ্ট—বন্যার জল শুধু রাস্তা বা বাড়ি নয়, থামিয়ে দিয়েছে গোটা জনজীবন। আর বহু পরিবারের কাছে আপাতত নৌকাই হয়ে উঠেছে একমাত্র জীবনরেখা।
Keep reading
More in জাতীয়

জাতীয়
পশ্চিমবঙ্গে সড়কে মহাবিপ্লব! ২০৭৭.১৮ কোটি টাকায় তৈরি হবে সেতু, রোড ওভারব্রিজ, হাতির আন্ডারপাস ও সার্ভিস রোড
উত্তরবঙ্গের যোগাযোগ ব্যবস্থায় বড়সড় বদলের পথে কেন্দ্র। ২,০৭৭.১৮ কোটি টাকা ব্যয়ে জাতীয় সড়ক-৩২৭-এর ৩১.০২ কিলোমিটার অংশ চার লেনে উন্নীত করার…
জাতীয়
জন্মাষ্টমীতে পুরী কুহেলিকাময়! মধ্যরাতেই বিশেষ রীতি, ‘মাতৃরূপে’ মহাবিষ্ণু—আজ কতক্ষণ বন্ধ থাকবে মন্দিরের দরজা?
শ্রীকৃষ্ণ জন্মাষ্টমী উপলক্ষে শুক্রবার বিশেষ রীতিতে সেজেছে পুরীর জগন্নাথ মন্দির। জন্মাষ্টমীর রাতে ‘কৃষ্ণ জন্ম নীতি’ পালনের জন্য সাধারণ দর্শনা…
জাতীয়
IndiGo Flight Accident: মুম্বই থেকে ‘ভূস্বর্গে’ পৌঁছেই বিপত্তি! পার্কিংয়ের সময় ইলেকট্রিক পোলে ধাক্কা, ক্ষতিগ্রস্ত বিমানের নাক
শুক্রবার সকালে শ্রীনগর বিমানবন্দরে বড়সড় বিপত্তির মুখে পড়ল IndiGo-র একটি বিমান। নবি মুম্বই থেকে শ্রীনগরগামী 6E 225 বিমানটি অবতরণের পর পার্…
জাতীয়
সোমবার থেকেই রাজ্যের ৬০ লাখ অ্যাকাউন্টে ১৫০০ টাকা! কারা পাবেন এই মাসিক ভাতা, জানুন বিস্তারিত
পশ্চিমবঙ্গের প্রায় ৬০ লক্ষ ষাটোর্ধ্ব উপভোক্তার জন্য বড় খবর। রাজ্যের বাড়ানো বার্ধক্য ভাতা ১,০০০ টাকা থেকে বেড়ে ১,৫০০ টাকা হয়েছে। নবান্ন সূ…
জাতীয়
Train Cancellation: ১২ ঘণ্টা লেট তিস্তা-তোর্সা! দেখা নেই একাধিক দূরপাল্লার ট্রেনের, ধসে বিপর্যস্ত উত্তরবঙ্গে ভয়াবহ পরিস্থিতি
টানা বৃষ্টিতে নিউ ফরাক্কার কাছে রেললাইনের নীচের মাটি বসে যাওয়ায় বিপর্যস্ত উত্তরবঙ্গের রেল যোগাযোগ। তিস্তা-তোর্সা-সহ একাধিক দূরপাল্লার ট্রেন…
জাতীয়
আবাসের টাকা নয়ছয়! রাজ্যের রিপোর্টে চরম ক্ষুব্ধ হাইকোর্ট, দিল বড় নির্দেশ
প্রধানমন্ত্রী গ্রামীণ আবাস যোজনার টাকা নয়ছয়ের অভিযোগে রাজ্যের রিপোর্টে অসন্তোষ প্রকাশ করল কলকাতা হাইকোর্ট। অভিযোগ ছিল, প্রকৃত উপভোক্তাদের বা…
