নিউইয়র্কে মোহন ভাগবতের অনুষ্ঠান ঘিরে বিক্ষোভ, ‘Politics of Hate’ বিতর্কে সরব মমদানি
নিউইয়র্কের ম্যাডিসন স্কোয়ার গার্ডেনে RSS প্রধান মোহন ভাগবতের নির্ধারিত অনুষ্ঠান ঘিরে বিতর্ক তুঙ্গে। ‘Universal Oneness Celebration’ নামের এই অনুষ্ঠানের বিরোধিতা করেছেন নিউইয়র্কের মেয়র জোহরান মমদানি। বিভিন্ন মানবাধিকার, আন্তঃধর্মীয় ও নাগরিক সংগঠনও প্রতিবাদ জানিয়েছে। অন্যদিকে RSS-এর দাবি, অনুষ্ঠানটি বহুধর্মীয় ও বহুসাংস্কৃতিক সংলাপের মঞ্চ।
লিখেছেন
Priya Jana
নিউইয়র্কে মোহন ভাগবতের অনুষ্ঠান ঘিরে বিক্ষোভ, ‘Politics of Hate’ বিতর্কে সরব মমদানি
নিউইয়র্কের ম্যাডিসন স্কোয়ার গার্ডেনে RSS প্রধান মোহন ভাগবতের নির্ধারিত অনুষ্ঠান ঘিরে বিতর্ক চরমে। ‘Universal Oneness Celebration’ নামে আয়োজিত এই অনুষ্ঠানে ভাগবতের বক্তব্য দেওয়ার কথা। কিন্তু অনুষ্ঠানটির আগে থেকেই একাধিক মানবাধিকার ও আন্তঃধর্মীয় সংগঠন প্রতিবাদে সরব হয়েছে। নিউইয়র্কের মেয়র জোহরান মমদানিও প্রকাশ্যে জানিয়েছেন, তিনি এই অনুষ্ঠানের সমর্থন করেন না।
কী নিয়ে বিতর্ক?
RSS-এর তরফে অনুষ্ঠানটিকে ঐক্য, পারস্পরিক সম্মান ও আন্তঃধর্মীয় সংলাপের উদ্যোগ হিসেবে তুলে ধরা হয়েছে। আয়োজকদের দাবি, ২০০-রও বেশি হিন্দু-আমেরিকান সংগঠন এই উদ্যোগের সঙ্গে যুক্ত। অনুষ্ঠানে ভারতীয় বংশোদ্ভূত উদ্যোক্তা, শিক্ষাবিদ, শিল্পী, ধর্মীয় নেতা এবং বিভিন্ন সম্প্রদায়ের প্রতিনিধিদের উপস্থিত থাকার কথা।
তবে সমালোচকদের বক্তব্য, RSS-এর হিন্দুত্ববাদী রাজনৈতিক মতাদর্শকে ‘ঐক্য’-র আবরণে আন্তর্জাতিক মঞ্চে তুলে ধরার চেষ্টা হচ্ছে। নিউইয়র্কে বিক্ষোভকারীদের একাংশের অভিযোগ, এই মতাদর্শ সংখ্যালঘুদের প্রতি বৈষম্য ও বিভাজনের রাজনীতিকে উৎসাহিত করে। RSS অবশ্য এই অভিযোগ প্রত্যাখ্যান করে নিজেদের একটি সাংস্কৃতিক ও সামাজিক সংগঠন হিসেবে তুলে ধরে।
মমদানির প্রকাশ্য বিরোধিতা
নিউইয়র্কের মেয়র জোহরান মমদানি জানিয়েছেন, তিনি মোহন ভাগবতের অনুষ্ঠানের সমর্থন করেন না। তবে অনুষ্ঠানটি একটি বেসরকারি আয়োজন হওয়ায় সেটি বাতিল করার ক্ষেত্রে নিউইয়র্ক শহরের আইনগত ক্ষমতা রয়েছে কি না, তা নিয়ে তিনি সংশয় প্রকাশ করেছেন।
মমদানি RSS-এর মতাদর্শকে ‘exclusionary’ বা বর্জনমূলক হিসেবে সমালোচনা করেছেন। তাঁর বক্তব্যের কেন্দ্রে রয়েছে ভারতের বহুত্ববাদী ও ধর্মনিরপেক্ষ পরিচয়ের প্রশ্ন। তাঁর এই অবস্থানকে কেন্দ্র করে মার্কিন ভারতীয় বংশোদ্ভূত সমাজেও নতুন করে রাজনৈতিক ও মতাদর্শগত বিতর্ক তৈরি হয়েছে।
‘Politics of Hate’ অভিযোগে প্রতিবাদ
মোহন ভাগবতের নিউইয়র্ক সফরের বিরুদ্ধে একাধিক আন্তঃধর্মীয় ও নাগরিক অধিকার সংগঠন প্রকাশ্যে অবস্থান নিয়েছে। Hindus for Human Rights, Indian American Muslim Council এবং Interfaith Center of New York-সহ কয়েকটি সংগঠন অনুষ্ঠান বাতিলের দাবি জানিয়েছে।
বিক্ষোভকারীদের বক্তব্য, RSS এবং হিন্দুত্বের রাজনীতিকে হিন্দু ধর্মের সমার্থক হিসেবে দেখা উচিত নয়। তাঁদের অভিযোগ, এই মতাদর্শের রাজনৈতিক প্রয়োগ ভারতের মুসলিম, খ্রিস্টান এবং অন্যান্য সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের মধ্যে নিরাপত্তাহীনতা তৈরি করেছে।
এই প্রেক্ষাপটেই ‘Politics of Hate’ বা ঘৃণার রাজনীতির অভিযোগ সামনে এসেছে। তবে এটি মূলত বিরোধী সংগঠন ও সমালোচকদের রাজনৈতিক ভাষ্য; RSS এই ধরনের অভিযোগ অস্বীকার করে।
মার্কিন ধর্মীয় স্বাধীনতা কমিশনের হস্তক্ষেপ
বিতর্ক আরও তীব্র হয় যখন U.S. Commission on International Religious Freedom (USCIRF) মার্কিন প্রশাসনের কাছে RSS সদস্যদের বিরুদ্ধে সম্ভাব্য নিষেধাজ্ঞা এবং মোহন ভাগবতের ভিসা প্রত্যাহারের বিষয় বিবেচনা করার আহ্বান জানায়। ভারত সরকার এই মন্তব্যকে পক্ষপাতদুষ্ট বলে প্রত্যাখ্যান করেছে।
ফলে ভাগবতের নিউইয়র্ক সফর শুধু প্রবাসী ভারতীয়দের মধ্যে রাজনৈতিক বিতর্কেই সীমাবদ্ধ থাকেনি; তা ভারত-মার্কিন সম্পর্ক, ধর্মীয় স্বাধীনতা এবং প্রবাসী রাজনীতির বৃহত্তর আলোচনার অংশ হয়ে উঠেছে।
RSS-এর পাল্টা বার্তা
মমদানির বিরোধিতার পর RSS-এর জাতীয় মুখপাত্র সুনীল আম্বেকর সংগঠনের পক্ষ থেকে পাল্টা বার্তা দিয়েছেন। তাঁর বক্তব্য, নিউইয়র্কের অনুষ্ঠানটি বহুসাংস্কৃতিক ও বহুধর্মীয় দর্শকদের সামনে RSS-এর ভাবনা তুলে ধরার একটি সুযোগ। সকল আগ্রহী মানুষকে অনুষ্ঠানে এসে সংগঠন সম্পর্কে জানার আহ্বানও জানানো হয়েছে।
RSS-এর বক্তব্য, ‘Universal Oneness Celebration’-এর মূল ভাবনা ভারতীয় ঐতিহ্যের ‘বসুধৈব কুটুম্বকম’—অর্থাৎ সমগ্র বিশ্ব এক পরিবার—এই ধারণার সঙ্গে যুক্ত।
প্রবাসী ভারতীয়দের মধ্যেও বিভাজন
মোহন ভাগবতের সফরকে ঘিরে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে বসবাসকারী ভারতীয়দের মধ্যেও মতভেদ স্পষ্ট হয়েছে। একদিকে RSS ও বিজেপির সমর্থকরা অনুষ্ঠানটিকে ভারতীয় সংস্কৃতি ও হিন্দু ঐতিহ্যের আন্তর্জাতিক পরিচিতি বৃদ্ধির উদ্যোগ হিসেবে দেখছেন। অন্যদিকে বিরোধীদের বক্তব্য, ধর্মীয় পরিচয়কে রাজনৈতিক মতাদর্শের সঙ্গে মিশিয়ে দেখার প্রবণতা প্রবাসী সমাজে বিভাজন আরও বাড়াতে পারে।
এই ঘটনাকে RSS-এর আন্তর্জাতিক ভাবমূর্তি পুনর্গঠনের প্রচেষ্টার অংশ হিসেবেও দেখছেন কিছু পর্যবেক্ষক। সংগঠনটির শতবর্ষ উপলক্ষে বিদেশে যোগাযোগ ও জনসংযোগ বাড়ানোর উদ্যোগ ইতিমধ্যেই শুরু হয়েছে।
কেন গুরুত্বপূর্ণ নিউইয়র্কের এই অনুষ্ঠান?
ম্যাডিসন স্কোয়ার গার্ডেনের মতো আন্তর্জাতিকভাবে পরিচিত একটি মঞ্চে RSS প্রধানের বক্তব্যকে শুধুমাত্র একটি প্রবাসী অনুষ্ঠান হিসেবে দেখছেন না রাজনৈতিক পর্যবেক্ষকরা। তাঁদের মতে, এর মাধ্যমে ভারতীয় বংশোদ্ভূত মার্কিন নাগরিকদের মধ্যে RSS-এর প্রভাব, সংগঠনের আন্তর্জাতিক গ্রহণযোগ্যতা এবং হিন্দুত্বের রাজনৈতিক ধারণা নিয়ে নতুন করে আলোচনা শুরু হয়েছে।
অন্যদিকে, মমদানির বিরোধিতা বিষয়টিকে আরও রাজনৈতিক মাত্রা দিয়েছে। ফলে মোহন ভাগবতের নিউইয়র্ক সফর এখন ভারতীয় প্রবাসী রাজনীতি, ধর্মীয় পরিচয়, মতপ্রকাশের স্বাধীনতা এবং বহুত্ববাদ—এই চারটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্নকে এক জায়গায় এনে দিয়েছে।
Keep reading
More in আন্তর্জাতিক
আন্তর্জাতিক
Gypsy Rose Blanchard-এর ভাই Dylan কে? Ken Urker-এর পর কেন আলোচনায় পরিবার
Gypsy Rose Blanchard-এর সৎভাই Dylan Blanchard সাধারণত প্রচারের আলো থেকে দূরে থাকেন। কিন্তু Gypsy-র প্রাক্তন বাগদত্তা ও তাঁর মেয়ের বাবা Ken U…
আন্তর্জাতিক
ফ্লাইদুবাইয়ের ‘ক্র্যাশ-চেষ্টা’র পর মনে পড়ছে আরও ৪ ভয়াবহ ককপিট ঘটনা
ফ্লাইদুবাইয়ের FZ1073 বিমানে সহ-পাইলটের বিরুদ্ধে ক্যাপ্টেনকে ছুরি দিয়ে হামলা এবং বিমানটি নিয়ন্ত্রণের চেষ্টা করার অভিযোগের পর ফের আলোচনায় ককপি…
আন্তর্জাতিক
ফ্লাইদুবাইয়ের ‘ক্র্যাশ-চেষ্টা’য় ভারতীয় পাইলট স্মিত মাচ্ছরকে কি কুঠার দিয়ে মারা হয়েছিল? কী বললেন নেটানিয়াহু
ফ্লাইদুবাইয়ের FZ1073 বিমানের ভারতীয় ক্যাপ্টেন স্মিত মাচ্ছরকে কীভাবে হামলা করা হয়েছিল, তা নিয়ে নতুন করে প্রশ্ন উঠেছে। ইজরায়েলের প্রধানমন্ত্রী…
আন্তর্জাতিক
ব্রাজিলের প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে লুলা বনাম ফ্লাভিও, সর্বশেষ জনমত সমীক্ষায় কী বলছে?
ব্রাজিলের প্রেসিডেন্ট নির্বাচনের প্রথম দফা ভোটের আগে নতুন একাধিক জনমত সমীক্ষায় প্রেসিডেন্ট লুইজ ইনাসিও লুলা দা সিলভা ও ফ্লাভিও বলসোনারো-র মধ…
আন্তর্জাতিক
অক্টোবরের US Visa Bulletin প্রকাশ, ভারতীয় Green Card আবেদনকারীদের জন্য কী বদলাল?
October 2026 Visa Bulletin প্রকাশের সঙ্গে নতুন মার্কিন অর্থবর্ষ শুরু হয়েছে। ভারতীয় employment-based Green Card আবেদনকারীদের জন্য EB-1-এ কিছু…
আন্তর্জাতিক
‘ইন্টারনেটের থেকেও বড়’, AI-এর নাম বদলে ‘Superintelligence’ করার প্রস্তাবে ফের জোর ট্রাম্পের
মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ফের কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তাকে ‘Artificial Intelligence’ না বলে ‘Superintelligence’ নামে অভিহিত করার প্রস্তাব…
