শেখ হাসিনা ডিসেম্বরে বাংলাদেশে ফিরবেন, কী অপেক্ষা করছে তাঁর জন্য?
বাংলাদেশের প্রাক্তন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ডিসেম্বরে দেশে ফেরার ইচ্ছা প্রকাশ করেছেন। ২০২৪ সালের গণঅভ্যুত্থানের পর ভারতেই রয়েছেন তিনি। বাংলাদেশে তাঁর বিরুদ্ধে মানবতাবিরোধী অপরাধের মামলায় মৃত্যুদণ্ডের রায় হয়েছে এবং তাঁর দল আওয়ামী লীগের কার্যক্রমও নিষিদ্ধ। ফলে ডিসেম্বরে দেশে ফিরলে গ্রেফতার, কারাবাস এবং আইনি প্রক্রিয়ার মুখোমুখি হওয়ার সম্ভাবনাই সবচেয়ে বড় প্রশ্ন হয়ে দাঁড়িয়েছে। একই সঙ্গে তাঁর প্রত্যাবর্তন বাংলাদেশের রাজনীতিতে নতুন করে উত্তেজনা তৈরি করতে পারে।
লিখেছেন
Priya Jana
ডিসেম্বরে দেশে ফিরতে চান শেখ হাসিনা
বাংলাদেশের রাজনীতিতে ফের এক বড় আলোড়ন তুলেছেন প্রাক্তন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। ভারত থেকে নির্বাসনে থাকা আওয়ামী লীগ নেত্রী জানিয়েছেন, তিনি আগামী ডিসেম্বরেই বাংলাদেশে ফিরতে চান। তাঁর বক্তব্য, ব্যক্তিগত নিরাপত্তার ঝুঁকি থাকলেও দেশের মানুষের পাশে দাঁড়ানোর দায়িত্ব থেকে তিনি সরে যেতে চান না।
গত জুলাই মাসে রয়টার্সকে দেওয়া সাক্ষাৎকারেও হাসিনা জানিয়েছিলেন, তিনি এবং আওয়ামী লীগের কয়েকজন শীর্ষ নেতা ডিসেম্বরের দিকে বাংলাদেশে ফিরে আদালতের কাছে আত্মসমর্পণ করতে প্রস্তুত। একই সঙ্গে তিনি স্বীকার করেছিলেন, দেশে ফিরলে তাঁকে গ্রেফতার করা হতে পারে, কারাগারে পাঠানো হতে পারে, এমনকি তাঁর প্রাণহানির আশঙ্কাও রয়েছে।
৫ আগস্টের এক অডিও বার্তায় তিনি ফের একই অবস্থান স্পষ্ট করেন। তাঁর কথায়, ভয় তাঁর দায়িত্ব নির্ধারণ করতে পারে না। ১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধের বিজয়ের মাস ডিসেম্বরেই দেশে ফেরার ইচ্ছার কথা জানান তিনি।
দেশে ফিরলে প্রথমেই কী হতে পারে?
শেখ হাসিনার সামনে সবচেয়ে বড় বাধা রাজনৈতিক নয়, আইনি। বাংলাদেশের আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল তাঁকে মানবতাবিরোধী অপরাধের মামলায় মৃত্যুদণ্ড দিয়েছে। তিনি অবশ্য এই অভিযোগ ও রায়কে রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিত বলে প্রত্যাখ্যান করেছেন। তাঁর অনুপস্থিতিতেই এই বিচার ও সাজা হয়েছে।
ফলে দেশে পা রাখার পর তাঁর গ্রেফতার হওয়ার সম্ভাবনা অত্যন্ত প্রবল। এরপর তাঁকে আদালতের রায় ও সংশ্লিষ্ট আইনি প্রক্রিয়ার মুখোমুখি হতে হতে পারে। বাংলাদেশের আইন বিশেষজ্ঞদের মধ্যেও প্রশ্ন উঠেছে, বাতিল হওয়া কূটনৈতিক পাসপোর্টের পর তিনি কোন নথিতে দেশে ফিরবেন এবং প্রত্যাবর্তনের ক্ষেত্রে ভারত-বাংলাদেশ প্রত্যর্পণ চুক্তির ভূমিকা কী হবে।
অর্থাৎ, হাসিনার ঘোষিত প্রত্যাবর্তন শুধুমাত্র রাজনৈতিক ‘কামব্যাক’ হবে না; এটি সরাসরি বাংলাদেশের বিচারব্যবস্থা, আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি এবং দুই দেশের কূটনীতির জন্যও বড় পরীক্ষা হয়ে উঠতে পারে।
আওয়ামী লীগের ভবিষ্যৎও বড় প্রশ্ন
শেখ হাসিনার প্রত্যাবর্তনের সঙ্গে জড়িয়ে রয়েছে আওয়ামী লীগের ভবিষ্যৎ। তাঁর নেতৃত্বাধীন দল বর্তমানে বাংলাদেশে নিষেধাজ্ঞার মুখে। হাসিনা প্রকাশ্যে এই নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহারের দাবি জানিয়েছেন।
তিনি দেশে ফিরে দলীয় নেতাকর্মীদের সঙ্গে রাজনৈতিকভাবে সক্রিয় হওয়ার চেষ্টা করলে নতুন করে সংঘাতের আশঙ্কা তৈরি হতে পারে। কারণ ২০২৪ সালের গণঅভ্যুত্থানের পর বাংলাদেশের রাজনৈতিক সমীকরণ আমূল বদলে গেছে। দীর্ঘ সময় ক্ষমতায় থাকা আওয়ামী লীগ এখন আগের অবস্থানে নেই এবং দলের বহু নেতা-কর্মী আত্মগোপনে বা দেশের বাইরে রয়েছেন।
তবে হাসিনার প্রত্যাবর্তন আদৌ বাস্তবে কতটা সম্ভব, তা নিয়ে প্রশ্ন রয়েছে। বাংলাদেশের অভ্যন্তরীণ রাজনীতি এবং আওয়ামী লীগের মধ্যেও তাঁর পরিকল্পনা নিয়ে অনিশ্চয়তা রয়েছে বলে বিভিন্ন প্রতিবেদনে উঠে এসেছে।
বাংলাদেশের রাজনীতিতে কী প্রভাব পড়তে পারে?
শেখ হাসিনা দেশে ফিরলে বাংলাদেশের রাজনীতিতে নতুন করে মেরুকরণ তৈরি হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে। একদিকে তাঁর সমর্থকরা এটিকে রাজনৈতিক প্রত্যাবর্তন হিসেবে দেখাতে পারেন, অন্যদিকে ২০২৪ সালের আন্দোলনে নিহতদের পরিবার এবং তাঁর বিরোধীরা বিচারের দাবিতে আরও সরব হতে পারেন।
বর্তমান বাংলাদেশ সরকারও হাসিনার প্রত্যাবর্তনকে অত্যন্ত সংবেদনশীল বিষয় হিসেবে দেখছে। ঢাকা দীর্ঘদিন ধরে ভারতের কাছে তাঁর প্রত্যর্পণের দাবি জানিয়ে আসছে। ভারত জানিয়েছে, বাংলাদেশের অনুরোধ আইনি প্রক্রিয়ার মাধ্যমে বিবেচনা করা হচ্ছে।
ফলে হাসিনা যদি সত্যিই ডিসেম্বর মাসে বাংলাদেশে ফেরেন, তা হলে তাঁর ব্যক্তিগত ভবিষ্যতের পাশাপাশি দেশের রাজনৈতিক স্থিতিশীলতাও বড় পরীক্ষার মুখে পড়তে পারে।
ভারত-বাংলাদেশ সম্পর্কেও নতুন চাপ
শেখ হাসিনার ইস্যু ইতিমধ্যেই ভারত-বাংলাদেশ সম্পর্কের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হয়ে উঠেছে। ঢাকা তাঁর প্রত্যর্পণ চাইলেও নয়াদিল্লি এখনও তাঁকে বাংলাদেশের হাতে তুলে দেয়নি। দুই দেশের সম্পর্ক স্বাভাবিক করার চেষ্টা চললেও হাসিনাকে ঘিরে মতবিরোধ পুরোপুরি কাটেনি।
বর্তমান বাংলাদেশ সরকার এবং ভারতের মধ্যে কূটনৈতিক আলোচনায় তাই হাসিনার ভবিষ্যৎ একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হয়ে থাকতে পারে। তাঁর প্রত্যাবর্তনের সিদ্ধান্ত বাস্তবায়িত হলে ভারত-বাংলাদেশ সম্পর্কেও তার সরাসরি প্রভাব পড়তে পারে।
শেষ পর্যন্ত কী অপেক্ষা করছে শেখ হাসিনার জন্য?
ডিসেম্বরে দেশে ফিরলে শেখ হাসিনার সামনে তিনটি বড় চ্যালেঞ্জ—আইনি লড়াই, নিরাপত্তা এবং রাজনৈতিক ভবিষ্যৎ। তিনি নিজেই গ্রেফতার, কারাবাস এমনকি প্রাণহানির ঝুঁকির কথা স্বীকার করেছেন।
তবে তাঁর ঘোষণার বাস্তবায়ন এখনও নিশ্চিত নয়। ঠিক কোন তারিখে তিনি ফিরবেন, কীভাবে দেশে প্রবেশ করবেন এবং ফেরার পর বাংলাদেশের কর্তৃপক্ষ কী পদক্ষেপ নেবে—এসব প্রশ্নের উত্তর এখনও স্পষ্ট নয়।
একটি বিষয় অবশ্য পরিষ্কার: শেখ হাসিনা যদি সত্যিই ডিসেম্বর মাসে বাংলাদেশে ফেরেন, তা হলে সেটি শুধুমাত্র একজন প্রাক্তন প্রধানমন্ত্রীর দেশে ফেরার ঘটনা হবে না। এটি বাংলাদেশের রাজনীতি, বিচারব্যবস্থা এবং ভারত-বাংলাদেশ সম্পর্ক—তিন ক্ষেত্রেই এক গুরুত্বপূর্ণ সন্ধিক্ষণ তৈরি করতে পারে।
Keep reading
More in আন্তর্জাতিক
আন্তর্জাতিক
Gypsy Rose Blanchard-এর ভাই Dylan কে? Ken Urker-এর পর কেন আলোচনায় পরিবার
Gypsy Rose Blanchard-এর সৎভাই Dylan Blanchard সাধারণত প্রচারের আলো থেকে দূরে থাকেন। কিন্তু Gypsy-র প্রাক্তন বাগদত্তা ও তাঁর মেয়ের বাবা Ken U…
আন্তর্জাতিক
ফ্লাইদুবাইয়ের ‘ক্র্যাশ-চেষ্টা’র পর মনে পড়ছে আরও ৪ ভয়াবহ ককপিট ঘটনা
ফ্লাইদুবাইয়ের FZ1073 বিমানে সহ-পাইলটের বিরুদ্ধে ক্যাপ্টেনকে ছুরি দিয়ে হামলা এবং বিমানটি নিয়ন্ত্রণের চেষ্টা করার অভিযোগের পর ফের আলোচনায় ককপি…
আন্তর্জাতিক
ফ্লাইদুবাইয়ের ‘ক্র্যাশ-চেষ্টা’য় ভারতীয় পাইলট স্মিত মাচ্ছরকে কি কুঠার দিয়ে মারা হয়েছিল? কী বললেন নেটানিয়াহু
ফ্লাইদুবাইয়ের FZ1073 বিমানের ভারতীয় ক্যাপ্টেন স্মিত মাচ্ছরকে কীভাবে হামলা করা হয়েছিল, তা নিয়ে নতুন করে প্রশ্ন উঠেছে। ইজরায়েলের প্রধানমন্ত্রী…
আন্তর্জাতিক
ব্রাজিলের প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে লুলা বনাম ফ্লাভিও, সর্বশেষ জনমত সমীক্ষায় কী বলছে?
ব্রাজিলের প্রেসিডেন্ট নির্বাচনের প্রথম দফা ভোটের আগে নতুন একাধিক জনমত সমীক্ষায় প্রেসিডেন্ট লুইজ ইনাসিও লুলা দা সিলভা ও ফ্লাভিও বলসোনারো-র মধ…
আন্তর্জাতিক
অক্টোবরের US Visa Bulletin প্রকাশ, ভারতীয় Green Card আবেদনকারীদের জন্য কী বদলাল?
October 2026 Visa Bulletin প্রকাশের সঙ্গে নতুন মার্কিন অর্থবর্ষ শুরু হয়েছে। ভারতীয় employment-based Green Card আবেদনকারীদের জন্য EB-1-এ কিছু…
আন্তর্জাতিক
‘ইন্টারনেটের থেকেও বড়’, AI-এর নাম বদলে ‘Superintelligence’ করার প্রস্তাবে ফের জোর ট্রাম্পের
মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ফের কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তাকে ‘Artificial Intelligence’ না বলে ‘Superintelligence’ নামে অভিহিত করার প্রস্তাব…
